প্রাণীজ আমিষের বিকল্প মাশরুম

স্বাস্থ্য

স্বদেশবাণী ডেস্ক: মাশরুম। মানব দেহের জন্য খুবই উপকারী ও ঔষধিগুণে ভরপুর একটি খাবার। অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন এ খাবারে আছে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, অ্যামাইনো এসিড, অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। স্বাদ, পুষ্টি ও ঔষধিগুণের কারণে এরইমধ্যে এটি সারা দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মাশরুমের পুষ্টিমান তুলনামূলকভাবে অত্যধিক এবং এর প্রোটিন অতি উন্নতমানের এবং মানব দেহের জন্য অতিশয় উপকারী। একটি পরিপূর্ণ প্রোটিনের পূর্বশর্ত হলো মানব দেহের অত্যাবশ্যকীয় ৯টি অ্যাসিডের উপস্থিতি। মাশরুমে অতীব প্রয়োজনীয় এ ৯টি অ্যামাইনো অ্যাসিড বিদ্যমান।
বিজ্ঞানীরা বলছেন—মাংস, পনির ইত্যাদি প্রাণীজ খাবারের সমান প্রোটিন রয়েছে মাশরুমে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা মেডিকেল স্কুলের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাশরুমে রয়েছে এসপিরিন-সদৃশ কিছু বৈশিষ্ট্য, যা হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। শীতকালীন ফ্লু প্রতিরোধেও মাশরুমের ভূমিকা রয়েছে। এটি কমায় গেঁটেবাতের ঝুঁকি।
শুধু তা-ই নয়, চীনের ঐতিহ্যবাহী কিছু প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিতে ফুসফুসের ক্যান্সার নিরাময়ে অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয় মাশরুম। চীনের এই ধারার চিকিৎসকদের মতে, মাশরুম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, পারে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মহিলার সাপ্তাহিক খাদ্যতালিকায় মাশরুম ছিলো তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি নেমে এসেছে তুলনামূলক অর্ধেকে।
ক্যান্সার চিকিৎসার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ কেমোথেরাপি। এর অবধারিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। কেমোথেরাপির কারণে রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে যাওয়া ঠেকাতে মাশরুমকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয় চীনে।
অন্যান্য প্রাণিজ আমিষ যেমন- মাছ, মাংস, ডিম অতি নামি-দামি খাবার হলেও এতে চর্বি সম্পৃক্ত অবস্থায় থাকায় যা অতি মাত্রায় গ্রহণ করলে শরীরে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে, যার ফলে মেদ-ভুঁড়ির সৃষ্টি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ প্রভৃতি জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
মাশরুমের প্রোটিনে-ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ অতি স্বল্প এবং কোলেস্টেরল ভাঙার উপাদান-লোভস্ট্রাটিন, অ্যান্টাডেনিন, ইরিটাডেনিন ও নায়াসিন থাকায় শরীরের কোলেস্টেরলস জমতে পারে না বরং মাশরুম খেলে শরীরে বহু দিনের জমানো কোলেস্টেরল ধীরে ধীরে বিনষ্ট হয়ে যায়। ১০০ গ্রাম শুকনো মাশরুমে ২৫-৩৫ গ্রাম প্রোটিন রয়েছে। পক্ষান্তরে আমরা যা অতি নামি-দামি খাবার হিসেবে মাছ, মাংস, ডিম খেয়ে থাকি তার মধ্যে ১০০ গ্রাম মাছ, মাংস ও ডিমে প্রোটিনের পরিমাণ হলো ১৬-২২ গ্রাম, ২২-২৫ গ্রাম  ও ১৩ গ্রাম মাত্র।
প্রাকৃতিকভাবে মাশরুমে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ও মিনারেল বিদ্যমান। মাশরুমে আছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাসিয়াম ও সেলেনিয়াম। সেলেনিয়াম উপাদানটি শুধু মাছেই পাওয়া যায়। যারা পুরোপুরি নিরামিষভোজী তারা মাশরুমের মাধ্যমে এ উপকারী উপাদানটি গ্রহণ করতে পারেন। মাশরুমে আরও আছে এরগোথিওনেইন নামে এক ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা মানব দেহের জন্য ঢালের মতো কাজ করে। মাশরুমে ভিটামিন বি-১২ আছে প্রচুর পরিমাণে যা অন্য কোনো উদ্ভিজ্জ উৎসে নেই। মাশরুম কোলেস্টেরল শূন্য। এতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণও খুবই সামান্য। এতে যে এনজাইম ও ফাইবার আছে তা দেহে উপস্থিত বাকি ব্যাড কোলেস্টেরলের বসতিও উজাড় করে দেয়।
গবেষকদের পরামর্শ হলো, সম্পূরক বা বিকল্প খাদ্য হিসেবে নয়, মাশরুম খেতে পারেন মূল খাদ্য হিসেবে। স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখতে রান্নার সময় বেছে নিন তাজা মাশরুম, যেগুলোতে কোনো দাগ কিংবা স্যাঁতসেঁতে ভাব নেই। রান্নার আগে মাশরুম ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন।
মাশরুমে উচ্চমাত্রার আঁশ থাকে, সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকে এবং প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম থাকে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়া মাশরুমে কোলেস্টেরল কমানোর অন্যতম উপাদান ইরিটাডেনিন, লোভাস্টটিন, এ টাডেনিন, কিটিন এবং ভিটামিন বি, সি ও ডি থাকায় নিয়মিত মাশরুম খেলে উচ্চ রক্তচাপও হৃদরোগ নিরাময় হয়। মাশরুমের ফাইবার বা আঁশ পাকস্থলী দীর্ঘক্ষণ ভরা রাখতে সাহায্য করে। মাশরুম রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ওজন কমাতে সহায়তা করে। উচ্চ ফ্যাট সমৃদ্ধ লাল মাংসের পরিবর্তে মাশরুম গ্রহণ করলে ওজন কমানো সহজ হয়।
এক গবেষণায় জানা যায়, লাল মাংসের পরিবর্তে সাদা মাশরুম গ্রহণ করলে ওজন কমে। মাশরুমে নিয়াসিন ও রিবোফ্লাবিন থাকে যা ত্বকের জন্য উপকারী। ৮০-৯০ ভাগ পানি থাকে যা ত্বককে নরম ও কোমল রাখে।
মাশরুমের ভিটামিন বি স্নায়ুর জন্য উপকারী এবং বয়সজনিত রোগ যেমন- আলঝেইমার্স রোগ থেকে রক্ষা করে। মাশরুম গ্রহণ করলে রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। মাশরুমে এনজাইম ও প্রাকৃতিক ইনসুলিন থাকে যা চিনিকে ভাঙতে পারে। এতে থাকা ফাইবার ও এনজাইম হজমে সহায়তা করে। এটি অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কাজ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং কোলনের পুষ্টি উপাদান শোষণকেও বাড়তে সাহায্য করে। মাশরুমের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন-ডি আছে। শিশুদের দাঁত ও হাড় গঠনে এ উপাদানগুলো অত্যন্ত কার্যকরী। মাশরুমে নিউক্লিক এসিড ও অ্যান্টি এলার্জেন থাকায় এবং সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকায় কিডনি রোগ ও এলার্জি রোগের প্রতিরোধক। মাশরুমে স্ফিংগলিপিড এবং ভিটামিন-১২ বেশি থাকায় স্নায়ুতন্ত্র ও স্পাইনাল কর্ড সুস্থ রাখে। তাই মাশরুম খেলে হাইপার টেনশন দূর হয় এবং মেরুদ- দৃঢ় থাকে। হেপাটাইটিস বি ও জন্ডিস প্রতিরোধ করে। অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। মাশরুমের খনিজ লবণ দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক।
কাঁচা মাশরুম কখনোই খাবেন না। কারণ, মাশরুমের আবরণ সহজপাচ্য নয়। এছাড়াও কাঁচা মাশরুমে এমন কিছু উপাদান আছে, যা পরিপাকতন্ত্রের এনজাইম বা পাচকরসকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তাই কাঁচা মাশরুম খেয়ে এর পুষ্টিগুণের প্রায় কিছুই আপনি পাবেন না। এছাড়া প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাশরুমে কিছু ক্ষতিকর উপাদানও থাকতে পারে। তাই মাশরুম রান্না করে খাওয়াটা সবদিক থেকেই নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন।
তবে ওষুধ হিসেবে নিজের ইচ্ছেমতো মাশরুম খাওয়া আর প্রক্রিয়াজাত মাশরুম খাওয়ার ব্যাপারে সচেতনতা অপরিহার্য। কারণ, ওষুধ হিসেবে যা আপনি খাচ্ছেন, সেটি উপকারী নাকি বিষাক্ত ও ক্ষতিকর মাশরুম থেকে প্রস্তুতকৃত তার নিশ্চয়তা জরুরি। এছাড়াও মাশরুমজাত ওষুধের ডোজ ও খাওয়ার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিয়ে খাওয়াই ভালো।
তথ্যসূত্র : হেলথ এন্ড নিউট্রিশন/বাংলাদেশ তথ্য বাতায়ন

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *