রাসায়নিকনির্ভর চাষাবাদে ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

কৃষি

স্বদেশবাণী ডেস্ক: দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে বছরে ৪০ হাজার টন কীটনাশক এবং ৫৫ হাজার টনের বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি পোল্ট্রি ও ডেইরি খামারগুলো হয়ে পড়েছে অ্যান্টিবায়োটিকনির্ভর। বেশি ফলনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে কৃষক।

এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানবদেহে। নিয়মনীতি ছাড়াই খাদ্যপণ্যে এসব ক্ষতিকরণ রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মানবদেহের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হয়ে পড়ছে। বাড়ছে রোগ-ব্যধি, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। এমনকি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে গর্ভের শিশুর ওপর। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও ভায়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পোকামাকড়ের কবল থেকে শাক-সবজি রক্ষার্থে কৃষকরা অবাধে ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করেন। রকমারি কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা মানছেন না কোনো নিয়মনীতি। অথচ এসব কীটনাশক জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশুদের জন্য হুমকিস্বরূপ। অধিক মুনাফার লোভে তারা এই ক্ষতিকর প্রক্রিয়ায় ফসল আবাদে ঝুঁকে পড়েছেন।

পোকামাকড়ের কবল থেকে শাক-সবজি রক্ষা করতে জমিতে অবাধে কীটনাশক স্প্রে করে সেই দিন অথবা পরদিন বাজারজাত করছেন। এ কারণে ব্রঙ্কাইটিসসহ শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতা, কিডনি ও লিভারের নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এমনকি গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটিযুক্ত বা অসুস্থ সন্তান জন্ম নিচ্ছে। এসব শাকসবজি খাওয়ায় মানবদেহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ফসলের ক্ষেতে ক্ষতিকর রাসায়নিক অতিব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা শক্তি প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করতে গিয়ে ফসলের উপকারী পোকামাকড়ও ধ্বংস হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ফসলের মাঠ গড়িয়ে খালে বিলে যাচ্ছে। এত খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে নানা জাতের পাখি ও প্রাণী।

এসব নিয়ে কথা হয় কেরানীগঞ্জের নতুন সোনাকান্দা এলাকার কৃষক দুদু মিয়ার সঙ্গে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, শীত মৌসুমে মুলা ও শিম ও কয়েক ধরনের শাকের আবাদ করেছেন। ভালো ফলনের জন্য নানা ধরনের সার থেকে শুরু করে কীটনাশক ব্যবহার করেছেন। তিনি জানান, কীটনাশক ব্যবহার তার ফলন ভালো হয়েছে, কোনো পোকা-মাকড়ের সংক্রমণ ঘটেনি।

তবে কতটুকু জমিতে কী পরিমাণে কীটনাশক সার ব্যবহার করতে হয় এবং ব্যবহারের কতদিন পর তা বাজারে বিক্রির জন্য উত্তোলন করতে হয় সে বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই তার। ভালো ফলনের জন্য নিজ ইচ্ছামতোই এসব ব্যবহার করেন তিনি। এমনকি ভালো দামের আশায় ফসল ওঠানোর আগেও কীটনাশক ব্যবহার করেন তিনি।

একই বিষয়ে কথা হয় সাভারের হেমায়েতপুরের কৃষক মো. মানিকের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, পারিবারিকভাবেই পূর্বপুরুষের পেশায় নিয়োজিত তিনি। যে কোনো ফসল উৎপাদন ও রক্ষায় নানা ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন। তবে এসব কতটুকু জমিতে, কোন ফসলে কী পরিমাণ সার বা কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় সে বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞান তার নেই।

২০১৫ সালে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি শীতের সবজি ফুলকপি ও লালশাকের নমুনায় কীটনাশকের রাসায়নিক মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। ওই বছরের ১ থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণা এসব সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ল্যাবরেটরি কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনের জন্য কৃষক পর্যায়, পাইকারি বাজার এবং খুচরা বাজার থেকে একাধিক নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষার পর দেখা গেছে কৃষক পর্যায়ে এসব নমুনায় ফুলকপির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কীটনাশক ম্যালাথিয়ন কেজি প্রতি ২৫১ মাইক্রোগ্রাম।

যার স্বাভাবিক মাত্রা কেজি প্রতি ২০ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ সবজিতে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ১২ গুণ বেশি কীটনাশকের উপস্থিতি ছিল। একইভাবে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ক্লোরোপাইরিফিস পাওয়া যায় কেজি প্রতি এক হাজার ৬০৫ মাইক্রোগ্রাম। যার স্বাভাবিক মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে সবজিতে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই রাসায়নিকের মাত্রা ছিল ৩২ গুণ বেশি। তবে এই পরিস্থিতির এখনও উন্নত হয়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে দেশে কৃষি খাতে ৩৫ হাজার ৫২৩ টন কীটনাশকের ব্যবহার করা হয়। ২০১৬ সালে কিছুটা বেড়ে ৩৫ হাজার ৭২৩ টন উন্নীত হয়। পাশাপাশি ২০১৭ সালে ব্যবহারের মাত্রা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ২৫৮ টন। অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০১৮ সালে আরেক দফা বেড়ে দেশে ফসলে কীটনাশক ব্যবহার করা হয় ৩৯ হাজার ২৩৭ টন।

অধিদফতর সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে কৃষি খাতে রাসায়নিক সার ব্যবহার হয়েছে ৩৯ লাখ ৯৫ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ লাখ ১ হাজার টনে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৩ লাখ ৪৬ হাজার টন। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যবহার হয় ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে হয় ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টন। অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে আরেক দফা রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় ৫৫ লাখ ৯০ হাজার টন।

বিভিন্ন রাসায়নিকের ব্যবহার প্রসঙ্গে কথা হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের উপ-পরিচালক (বালাইনাশক প্রশাসন) ড. জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কৃষকরা অনেক আগে থেকেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফসলে কীটনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহার করে আসছে। এতে যেমন ফসল ও জমির ক্ষতি হয়, ঠিক তেমনিভাবে মানবদেহ ও প্রকৃতির ক্ষতি হচ্ছে।

তাই অধিদফতরের পক্ষ থেকে জৈবভাবে তৈরি কীটনাশক ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। এছাড়া উপজেলা ও জেলা পর্যায় অধিদফতরের পক্ষ থেকে কৃষক প্রশিক্ষণ, লিফলেট বিতরণসহ অনিয়ন্ত্রিতভাবে কীটনাশক ব্যবহারে ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃতিক উপায়ে উৎপাদন বাড়ানো ও বালাই দমনে কাজ চলছে।

এদিকে কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, আইপিএম কর্মকাণ্ড, সুষম সার ব্যবহার, কীটনাশক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, উদ্বুদ্ধকরণ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার কমেছে। তবে শাকসবজি, ডাল, তেল এবং মসলা জাতীয় ফসলের আবাদ বৃদ্ধি, ফলবাগানের সংখ্যা বাড়ায় আগাছানাশকের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে ছত্রাকনাশকের ব্যবহারও বাড়েছে। এসব কারণে বর্তমানে কীটনাশকের ব্যবহারও তুলনামূলক বেড়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে সঠিকভাবে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদের উপায় নিয়ে কাজ চলছে। সেভাবে অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। সবার প্রচেষ্টায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে কীটনাশক ব্যবহার কমছে। ভোক্তাদের বিষমুক্ত সবজি সরবরাহে কৃষকদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে কৃষকের বাজার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে অর্গানিকভাবে উৎপাদিত সবজি ভোক্তার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের বাজার স্থাপন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পশু-পাখি পালন খামার এবং মৎস্য খামারগুলোতে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগ-জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। এসব কারণে অসুস্থ হওয়ার পরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কোনো সুফল পাওয়া যায় না।

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে ২০১৫ সালের ওয়ার্ল্ড হেল্থ অ্যাসেম্বলিতে অ্যান্টিবায়োটিককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচ্যসূচিতে রাখা হয়। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নীতিনির্ধারণী ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে। সংস্থা ২০১১ সাল থেকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স নিয়ন্ত্রণ রাখার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা বিষয়টি ইতোমধ্যে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কৌশলপত্র, কর্মপরিকল্পনা, ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতো ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর এবং প্রাণী ও মৎস্য সম্পদ অধিদফতর একই ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ না করলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স নিয়ন্ত্রণ সহজসাধ্য হবে না।

এমনটি জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ডা. একেএম সামছুজ্জামান। তিনি বলেন, পরজীবী রোগজীবাণু দিনে দিনে যেভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে তাতে করে মানবস্বাস্থ্যসহ প্রাণিকুলের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। তিনি ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *