আফগানিস্তান থেকে তুর্কি সেনা প্রত্যাহার এরদোগানের ব্যর্থতা নাকি কূটনৈতিক সফলতা?

আন্তর্জাতিক
স্বদেশ বাণী ডেস্ক: অবশেষে আফগানিস্তান ছেড়েছে তুর্কি সেনারা। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তুরস্কের সেনারা আফগানিস্তানে তাদেরকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল সে দায়িত্ব সফলভাবে শেষ করে দেশে ফিরছে। যত দ্রুত সম্ভব তাদের এই দেশে ফেরা সম্পন্ন করতে চায় তুরস্ক।
কিন্তু এর মধ্যে কাবুল বিমানবন্দরে ভয়াবহ বোমা হামলায় মারা যান শতাধিক মানুষ। এ কারণে তুরস্কের সেনা প্রত্যাহার বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে বন্ধ ছিল, এখন তা আবার শুরু হয়েছে। তবে বিশেষ বাহিনীর একটা অংশ সেখানে থাকবে আরও কিছুদিন। কিছু যন্ত্রপাতি ধ্বংস করার জন্য।

তুর্কি সেনাদের এই ফেরার মাধ্যমে অবশেষে স্বস্তি পেল মুসলিম বিশ্ব। তুরস্ক কয়েক মাস আগে যখন কাবুলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়ার ইচ্ছা পোষণের ঘোষণা দেয় তখন থেকে এ নিয়ে ব্যাপক উৎকণ্ঠায় ছিল মুসলিম বিশ্বের অনেকেই। কারণ, একদিকে যেমন তুরস্ক সেখানে থাকার ইচ্ছা বারবার ব্যক্ত করেছিল, অন্যদিকে তুর্কি সেনাদের সেখানে কোনভাবেই মেনে নেবে না বলেও বারবার ঘোষণা দিয়ে আসছিল আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসা তালেবান।

তালেবানের মতে, তুরস্কের সেনাবাহিনী সেখানে ন্যাটোর অংশ হিসেবে গিয়েছে এবং তাদেরকে অবশ্যই নাটোর সঙ্গে ফিরে যেতে হবে। এমনকি এরকমও বলা হয়েছে যে, তুরস্কের সেনাবাহিনী সেখানে থাকলে অর্থাৎ ৩১ আগস্টের পর সেখানে থাকলে তারা তালেবানের টার্গেটে পরিণত হবে।

তখন অনেকেই এমন ধারণা করেছিলেন যে, হয়তো তুরস্ক সেখানে জোর করেই থাকবে এবং তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে। যদিও আমি সেই শুরু থেকেই বলে আসছি, কোনো সমঝোতা ছাড়া তুরস্ক সেখানে থাকবে না এবং তালেবানের সঙ্গে তুরস্ক যুদ্ধে জড়াবে না। শেষ পর্যন্ত তাই হল, কোন সমঝোতা না হওয়ায় তুরস্ক আফগানিস্তান থেকে তার সৈন্যদের ফিরিয়ে নিয়ে আসছে।

এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।

১. তুরস্কের সেখানে সমঝোতা হলো না কেন?
২. তুরস্কের সৈন্য ফিরিয়ে আনায় কার কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হবে?
৩. ভবিষ্যতে তালেবানের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক কেমন হবে?
তুরস্কের সৈন্য রাখা নিয়ে সমঝোতা না হওয়ার অনেকগুলো কারণ ছিল। প্রথম কারণ হলো তালেবানের অপ্রত্যাশিত দ্রুত গতিতে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়া। আর আশরাফ গনি সরকারের পতন। এবং শেষ পর্যন্ত কাবুল থেকে বিদেশী দূতাবাস এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।

আপনারা জানেন যে, তুরস্কের কাবুল বিমানবন্দরের দায়িত্ব নেয়ার একটা বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল এই বিদেশী দূতাবাসগুলো এবং তাদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিরাপত্তা এবং কাবুলের সঙ্গে বহির্বিশ্বের নিরবিচ্ছিন বিমান যোগাযোগ নিশ্চিত করা। এখন যেহেতু সেই পরিস্থিতি নেই সেহেতু এই সেনাদের কাবুলে থাকার প্রয়োজনও অনেকাংশেই কমে গিয়েছে। যা আমি বলেছিলাম তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার দিন।

সেদিন ওই কথাও বলেছি, এখন তুর্কি সেনাদের সেখানে থাকার আর দরকার নেই। তবে বিষয়টি তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ানের প্রেস্টিজ বা মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যদিও তুরস্কের ৬২ ভাগ মানুষও সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাই এখানে এরদোয়ানের প্রেস্টিজের চেয়ে পরিস্থিতির বাস্তবতাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

আরেকটি বিষয় ছিল, কাবুল বিমানবন্দরে থাকা নিয়ে তুরস্ক যে সব শর্ত দিয়েছে সেগুলো। আমি শুরুর দিকে বলেছিলাম যে তুরস্ক সে সব শর্ত দিয়েছে তা পশ্চিমাদের তথা আমেরিকা এবং ন্যাটোর মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। গত সোমবার সিআইএ প্রধান এবং তালেবান নেতার কাবুলে গোপন  বৈঠকের পরে পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা ৩১ আগস্টের মধ্যে সেনা উঠিয়ে নিবে এবং তার পরে কাবুল বিমানবন্দরে কিছু ঘটলে তাদের কোনো দায় থাকবে না। অর্থাৎ এর পরে কাবুল বিমানবন্দরে তুরস্কের সেনারা থাকলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরণের সহযোগিতা করবে না। অথচ তুরস্কের প্রধান যে চারটি শর্ত ছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা। সুতরাং তখনই বোঝা গিয়েছে যে, তুরস্ক তার সেনাদের সেখানে রাখবে না। যদিও এর মধ্যেই কাবুলে ঘটে গেলো স্মরণকালের ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা।

আর তুরস্কের সেনা প্রত্যাহারে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি কাজ করেছে তা হলো তালেবানের সিদ্ধান্তে অনড় থাকা। তারা শুরু থেকেই যেরকম বলে আসছে যে তুরস্কের সেনাবাহিনীকে তারা ন্যাটোর সদস্য হিসেবে মেনে নেবে না। তারা তাদের সেই অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্রও নড়চড় করেনি। তুরস্ক কোনোভাবেই তাদেরকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পারেনি। অর্থাৎ তুরস্ক তাদেরকে কনভিন্স করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। সুতরাং তালেবান তুরস্ক সেনাদের মেনে নেয়নি এবং শেষ পর্যন্ত তুরস্কের সেনারা ১১ শতাধিক লোককে নিরাপদে ফিরিয়ে এনে তাদের দায়িত্ব শেষ করে এখন তারাও ফিরে আসছে।

অর্থাৎ তুরস্ক কাবুল বিমানবন্দরের দায়িত্ব নেয়ার যে ইচ্ছা পোষণ করেছিল তা পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং আমেরিকা ও তালেবানের সিদ্ধান্তের কারণে পূরণ হয়নি। তুরস্ক যেহেতু জোর করে সেখানে থাকার কথা বলেনি। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে এসে সেখানে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছিল এবং আলোচনা সফল না হলে সেখান থাকবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছিল। তাই তুরস্কের এই সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আসায় দেশটির সঙ্গে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সরকারের খুব বড় ধরনের দ্বন্দ্ব হওয়ারও আশংকা নেই।
তুরস্কে এর প্রভাব কী প্রভাব পড়বে?
এর একটা বড় প্রভাব পরবে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরেকটা প্রভাব পড়বে তুরস্কের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্কে।
তুরস্ক ওখানে থাকা নিয়ে যে ডেঞ্জারাস গেইমটা বা বিপজ্জনক খেলাটা খেলতে চেয়েছিল সেটায় সফল না হওয়ায় তুরস্কের মধ্যেও এমনকি সরকারের মধ্যেও একটা বড় অংশ হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কারণ, এ বিষয়টি নিয়ে তারাও অস্বস্তিতে ছিল।
অন্যদিকে এর মাধ্যমে যারা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছে সেই শুরু থেকেই, তাদের আশাও পূরণ হলো। তারা এখন অবশ্য নতুন সুর তুলবে যে, এটা হচ্ছে তুরস্কের পরাজয়। তারা হয়তো বলবে, কি চেয়েছিলে না ওখানে থাকতে? এখন তো পারলে না? এগুলো দিয়ে হয়তো তারা সরকারকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে চাইবে। কিন্তু এগুলো হালে পানি পাবে না।
এই সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে তুরস্কের সরকার যে যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেটাই আরেকবার প্রমাণ হলো। একে বলে পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। আবেগ বা প্রেস্টিজের চেয়ে বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া।

তুরস্কের সেখানে যে বিনিয়োগ ছিল তার কী হবে?

তুরস্কের বেশিরভাগ কাজ ছিল রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ইত্যাদি  তৈরি করা বা মেরামত করা। সেগুলো সেখানে আছে, থাকবে এবং চলবে। এই কর্মকাণ্ডগুলো ভবিষ্যতে হয়তো আরও বাড়বে। তুরস্কের দূতাবাসও খোলা আছে এবং চালু থাকবে। তবে আফগান পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে কিছু লোককে তুরস্ক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাদের অবস্থা কী হবে? সেটা হয়তো তালেবান বা ভবিষ্যতে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা সিদ্ধান্ত নেবে। এক্ষেত্রে তুরস্ক হয়তো তাদেরকে নতুন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীতে নেয়ার জন্য তালেবানের ওপর চাপ দিবে।
তবে তালেবান তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নে তুরস্কের সাহায্য চেয়েছে, তুরস্কের বিনিয়োগ চেয়েছে, তুরস্কের ডাক্তার এবং ইঞ্জিয়ারদের সেখানে আহ্বান করেছে, এগুলো হয়তো ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত রচনা করবে।

এমনকি কাবুল বিমানবন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব নিতে তুরস্ককে অনুরোধ করেছে তালেবান। তুরস্কের কাবুল দূতাবাসে এ নিয়ে সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠক হয়। তবে তুরস্ক এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তালেবানের কাজে কর্মের মিল দেখতে চায় তুরস্ক। যে সব প্রতিশ্রুতি তালেবান দিয়েছে সেগুলোর বাস্তবে প্রয়োগ দেখতে চায় তুরস্ক। আর আফগানিস্তানে সবার অংশগ্রহণে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনেও সহযোগিতা করতে আগ্রহী আঙ্কারা।

ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তুরস্ক সব দল, গোষ্ঠী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। তাদের মধ্যে আছে আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ, গুলবুদ্দিন হেকমাতিয়ার এবং অন্যরাও।
তুরস্ক এখনও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটা দেশ। ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় তুরস্কের সঙ্গে পশ্চিমাদের সামরিক সম্পর্ক এখনও শক্ত অবস্থানে। দেশটির প্রযুক্তিগত, সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তি ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আফগানিস্তানের স্বীকৃতিতেও সহযোগিতা করতে পারে তুরস্ক। এখন যেহেতু কাবুল বিমানবন্দরের বিষয়টি একটা মীমাংসায় এলো, তাই এর পরে তুরস্কের সঙ্গে আফগানিস্তানের বা তালেবানের সম্পর্ক দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

তবে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা এবং দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার আগেই  বিভিন্ন দেশ যে নতুন নতুন চাল চালবে, নতুন করে ছক আঁকবে, নতুন করে গেইম খেলতে চাইবে সেখানে তুরস্ক কোন বলয়ে অবস্থান নেয় সেটাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।

পূর্ব বলয়ে নাকি পশ্চিম বলয়ে? নাকি এই দুই বলয়ের মাঝে? তবে এখানে একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, আফগানিস্তান নিয়ে পূর্ব-পশ্চিমা বলয় হচ্ছে ঠিকই। যেমন একদিকে চীনের নেতৃত্বে রাশিয়া, পাকিস্তান, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে পূর্ব বলয় হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্রিটেনের নেতৃত্বে হচ্ছে পশ্চিম বলয়। কিন্তু কোনো মুসলমান বলয় হচ্ছে না।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যেমন জি-৭ দেশগুলোর প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেছেন এবং আফগানিস্তান নিয়ে একত্রে চলার ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড়  সংগঠন ওআইসিও কিন্তু পারতো তাদের নেতাদের জরুরি বৈঠক ডেকে আফগানিস্তান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে।

তারা বলতে পারতো যে মুসলিম দেশগুলো আফগানিস্তান নিয়ে একত্রে চলবে, একত্রে সিদ্ধান্ত নেবে কিংবা তালেবানের সরকারকে একত্রে স্বীকৃতি দিবে। কিন্তু আমি এরকম কোনও কার্যক্রম লক্ষ্য করিনি। আসলে ওআইসি যত শক্ত অবস্থান নেবে আফগানিস্তান তত শক্তিশালী হবে এবং দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এই দেশটিতে।
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *