গ্রেফতার নদীকে নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিল পুলিশ

জাতীয় লীড

স্বদেশবাণী ডেস্ক: পুলিশের হাতে গ্রেফতার আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য নদী আক্তারের (২৮) স্বামী রাজীব হোসেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন। বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হওয়ার পর নদী পাচার চক্রে জড়িয়ে পড়েন।

কখনো ইতি, কখনো জয়া আক্তার, কখনো জান্নাত, আবার কখনো নূরজাহান বা অন্য নাম। এসব নামে ২০১৫ সাল থেকে ভারত, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে নারী পাচার করে আসছিল সে।

মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার মো. শহিদুল্লাহ এ তথ্য জানান।

সোমবার নড়াইল ও যশোর সীমান্তে অভিযান চালিয়ে নদী আক্তার ইতিসহ মানব পাচার চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেফতার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ।

তারা হলো- আল আমিন হোসেন, সাইফুল ইসলাম, আমিরুল ইসলাম, পলক মন্ডল, তরিকুল ইসলাম ও বিনাশ শিকদার।

মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ভিন্ন নামে তিন দেশে নারী পাচারের সমন্বয়ক হিসাবে কাজ করত নদী। পুলিশ তার ১০টি ছদ্মনাম পেয়েছে।

তিনি জানান, ২০০৫ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসী রাজীব হোসেনের সঙ্গে নদীর বিয়ে হয়। ওই বছরই বন্দুকযুদ্ধে রাজীব নিহত হয়। এরপর নদী পাচার চক্রে জড়িয়ে পড়ে। চক্রে সে নদী পরিচয় দিলেও ভারতীয় আধার কার্ডে তার নাম জয়া আক্তার জান্নাত। বাংলাদেশি পাসপোর্টে তার নাম নূরজাহান। সাতক্ষীরা সীমান্তে তার নাম জলি, যশোর সীমান্তে প্রীতি নামে পরিচিত।

ডিসি বলেন, পাচারের উদ্দেশ্যে আনা মেয়েদের যশোর সীমান্তের বিভিন্ন বাড়িতে রেখে সুযোগমতো ভারতে পাচার করত চক্রটি। পাচার করা প্রত্যেক নারীর বিপরীতে স্থানীয় এক ইউপি সদস্য এক হাজার টাকা করে নিত। পাচারকালে কোনো নারী বিজিবির কাছে আটক হলে সেই ইউপি সদস্য আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসত।

আর গ্রেফতার হওয়া আল আমিন হোসেন ২০২০ সালে ঈদুল আজহার চারদিন পর নারী পাচার করতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে আহত হয়।

তিনি বলেন, পাচারের উদ্দেশ্যে আনা মেয়েদের তার বাড়িতে রেখে সুযোগমতো ভারতে পাঠানো হতো। সে মাদক ব্যবসায়ও জড়িত। তার নামে যশোরের শার্শা থানায় দুটি মাদক মামলা রয়েছে।

আর সাইফুল ইসলামের শার্শার পাঁচভুলট বাজারে মোবাইল রিচার্জ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা রয়েছে। মানব পাচারে জড়িত ইস্রাফিল হোসেন খোকন, আব্দুল হাই, সবুজ, আল আমিন ও একজন ইউপি সদস্য তার (সাইফুল) মাধ্যমে মানব পাচার থেকে অর্জিত অর্থ বিকাশে লেনদেন করত।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেলে সে মানব পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের সতর্ক করে দেয়।

পুলিশের এ কর্মকর্তা আরও বলেন,  বিকাশ ট্রানজেকশনে ব্যবহৃত মোবাইলটি জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতার পলক মন্ডল যশোরের মনিরামপুর ঢাকুরিয়া স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার গাহঘাটা থানার নলকড়া গ্রামে নানা বাড়িতে যায়। সেখানে পঞ্চগ্রাম স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক শেষ করে।

পরে বিএমএস ডিগ্রি নিয়ে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শুরু করে। বেনাপোলের ইস্রাফিল হোসেন খোকন, ভারতে অবস্থানকারী বকুল ওরফে খোকন, তাসলিমা ওরফে বিউটি ও চক্রের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

‘আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা নিতে আসা গ্রাম্য দরিদ্র মেয়েদের ব্যাঙ্গালুরুতে তাসলিমা ওরফে বিউটি নামে একজনের কাছে পাঠানোর মাধ্যমে নারী পাচারের হাতেখড়ি পলক মন্ডলের। পরে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা মেয়েদের আধার কার্ড প্রস্তুত করে দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ ‘সেফ হোমে’ অবস্থান এবং ব্যাঙ্গালুরে নির্ধারিত স্থানে পাঠানোর দায়িত্ব নেয়।

এছাড়াও সে ভারতীয় আধার কার্ড ও ভারতের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত আইডি কার্ডধারী। সে উত্তর প্রদেশের গোরাক্ষপুর জেলার বড়ালগঞ্জ থানার নেওয়াদা গ্রামেও থেকেছে। তার কাছ থেকে ভারতীয় আধার কার্ড, সেদেশের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আইডি কার্ড, ভারতীয় আয়কর বিভাগের দেওয়া আইডি কার্ড, ভারতীয় সিম কার্ড ও একজন ভিকটিমের আধার কার্ড জব্দ করা হয়েছে।’

ডিসি শহীদুল্লাহ বলেন, গ্রেফতার হওয়া বিনাশ সিকদার নড়াইলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। সে বেনাপোলে বাসা ভাড়া নিয়ে পাসপোর্ট ফরম পূরণের কাজ করত। তার স্ত্রী সোনালী সিকদার ভারতীয় নাগরিক। বেনাপোলে পাসপোর্ট ফরম পূরণের কাজ করতে গিয়ে ইস্রাফিল হোসেন খোকন, আব্দুল হাই সবুজ ও মানব পাচারে জড়িত আরও কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

পরিচয়ের সূত্র ধরে সে মানব পাচারের জড়িয়ে পড়ে। যশোর ও নড়াইল থেকে ভারতে উচ্চ বেতনে চাকরি প্রলোভন দেখিয়ে আনা নারীদের খোকন, আল আমিন, তরিকুল, আমিরুল ও আরও কয়েকজনের মাধ্যমে সীমান্ত পার করে ভারতীয় দালালদের কাছে পৌঁছে দেয়। তার কাছ থেকে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও দুটি মোবাইল জব্দ করা হয়েছে।

গ্রেফতারকৃতরা ভারতীয় পরিচয়পত্র কীভাবে তৈরি করছে এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, এগুলো তৈরিতে ভারতীয় লোকেরা সহয়তা করেছে। নদীর সঙ্গে টিকটক হৃদয়ের ঘনিষ্ঠতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদী, হৃদয় বাবুসহ আরও দু-একজনের নাম আগে উল্লেখ করেছিলাম। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

সাতক্ষীরা ও যশোরে মানব পাচারের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে ডিসি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছি স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি নারী পাচারে জড়িত। তবে তদন্তের শেষ পর্যায়ে বলতে পারব কারা কারা পাচারে সহযোগিতা করেছেন। যাদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *