একবার রোলকলে অনুপস্থিত থাকায় ডিসি কোর্স বাতিল!

জাতীয়
স্বদেশ বাণী ডেস্ক:  লঘু অপরাধে গুরুদণ্ডের শিকার হয়েছেন পুলিশের দুই শতাধিক কর্মকর্তা। ছোট ভুলে ভেঙে গেছে তাদের বড় স্বপ্ন।
এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে ঈদের রাতে রোল কলে অনুপস্থিত থাকায় তাদের ডিসি কোর্সটি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
এরফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। শেষ পর্যন্ত বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে ক্ষতি হবে ১৬ কোটি টাকা। অপরদিকে প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ২১২ জনের মধ্যে পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছিল।
বাকিদের বিরুদ্ধে অপরাধ অনুযায়ী বিভিন্ন শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি পিটিসিতে প্রক্রিয়াধীন ছিল। কিন্তু যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সেই সুযোগ না দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর সরাসরি ব্যবস্থা নিয়েছে সবার বিরুদ্ধে (২১২ জনের)। এ ক্ষেত্রে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা অপরাধের চেয়ে অনেক গুণ বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।
বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় অবস্থা বিরাজ করছে পর্দার আড়ালে। শৃঙ্খলাবাহিনী হওয়ায় ক্ষোভের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। ভুক্তভোগী পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতিনিধি দল এবং পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন নেতারা বেশ কয়েকবার দেখা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের আইজি এবং পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
এ নিয়ে আদালতের আশ্রয় নিতে চাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তারা। কিন্তু ৩ মাস ধরে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ঝুলিয়ে রাখার কারণে সে সুযোগ থেকেও বঞ্চিত তারা।
প্রসঙ্গত, ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের চাকরির বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তারা সবাই বিভাগীয় সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই)। কনস্টেবল হিসাবে চাকরি জীবন শুরু করে পদোন্নতি পেয়ে এসআই হয়েছেন। ডিসি কোর্স (ডিপার্টমেন্টাল ক্যাডেট) সমাপ্ত হলেই এসআই হিসাবে তাদের চাকরি স্থায়ী হতো। পাশাপাশি পরিদর্শক হিসাবে পদোন্নতি পাওয়ার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতেন তারা।
সাবেক আইজপি নূর মোহাম্মদ যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের চাকরিতে প্রশিক্ষণকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। রোলকলে অনুপস্থিতি অসদাচরণের শামিল। তবে যার যতটুকু অপরাধ তার ততটুকু শাস্তিই হওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে, পুলিশ সদর দপ্তর হলো পুরো বাহিনীর কন্ট্রোলিং অথরটি। অবশ্য সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
সাবেক আইজপি একেএম শহীদুল হক বলেন, ‘যে কোর্সটি বাতিল করা হয়েছে, সেটি পুনরায় সম্পন্ন করতে হলে ব্যক্তিগত ও সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশপাশি অনেক সময় নষ্ট হবে।
দৃশ্যত মনে হচ্ছে, একটি অপরাধে তাদের দুটি শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যা অপরাধের তুলনায় অনেক বেশি।’
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এ কোর্সে মনোনীত হতে পদোন্নতির পর দুই বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের। মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও চাকরির খতিয়ান সন্তোষজনক হওয়ার পর ৮৬৭ জন এসআই গত বছরের ১৪ জুন থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাস বাস্তব প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।
১৪ ডিসেম্বর থেকে টাঙ্গাইলে অবস্থিত পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে (পিটিসি) মৌলিক প্রশিক্ষণ (১৯তম ডিসি কোর্স) শুরু করেন তারা। এক বছর মেয়াদি ওই কোর্সের ১১ মাস ১৫ দিন তারা বেশ সুনামের সঙ্গে পার করেছিলেন। শেষ হয়েছিল কোর্সের সমাপনী পরীক্ষাও।
সমাপনী কুচকাওয়াজ, সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রশিক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক পিটি-প্যারেডের জন্য সময় বাকি ছিল মাত্র ১৫ দিন। ঠিক ওই সময়ে একদিন রাতে রোলকলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ২১২ কর্মকর্তার পুরো কোর্সটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২৫ মে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিকে (এইচআরএম) দেওয়া পুলিশের ডিআইজি ও পিটিসির কমান্ড্যান্ট ময়নুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩ মে রাত ৮টার রোলকলের পর থেকে ১৫ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৪৯ জন, বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ৬১ জন এবং রাত ৮টা পর্যন্ত দুজনসহ ২১২ জন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে গরহাজির ছিলেন। সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বশীল সদস্য হয়েও তারা মৌলিক প্রশিক্ষণ চলাকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং প্রশিক্ষণের সঠিক রুলস না মেনে পিটিসি ত্যাগ করে বিভাগীয় রুলস ভঙ্গ ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করেছেন।
এ বিষয়ে পিটিসি তাদের প্রত্যেককে কৈফিয়ত তলব করে। তাদের দাখিল করা জবাব সন্তোষজনক নয়। পিটিসিতে প্রত্যাবর্তনের পর নিয়মানুযায়ী তাদের প্রত্যেকের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়।
এদের মধ্যে পাঁচজনের করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়। তারা হলেন- তরিকুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, মাহবুব আলম গোলাম কবির, মোস্তফা কামাল এবং আবুল কালাম আজাদ।
তারা করোনা আক্রান্ত হয়ে পিটিসির সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্যান্য প্রশিক্ষণার্থীদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছেন। তাই তাদের পিটিসির প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখা হয়।
পরবর্তীতে পাঁচজনকে ডিসি কোর্স থেকে অব্যাহতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য এআইজিকে (রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্লানিং-১) চিঠি দেওয়া হয়। পাশাপাশি ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র তাদের নিজ নিজ মাতৃ ইউনিটে পাঠানো হয়।
পিটিসির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০৭ জনকে শাস্তি হিসাবে সর্বোচ্চ এক মাসের ডিটেনশন দেওয়া যেতে পারে। তাই পুলিশ সদর দপ্তরকে চিঠি দিয়ে বলেছিলাম, তাদের শাস্তির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু আমাদের চিঠি স্বাক্ষরের একদিনের মধ্যেই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ২১২ জনের কোর্স বাতিল ও তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে আমাদের তদন্তের প্রতিফলন ঘটেনি।’ এক প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্ত শিরোধার্য। যার একবার ফাঁসি হয়ে গেছে তাকে তো আর দুই বছরের জেল দিয়ে লাভ নেই। তাই আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারিনি। পুলিশ সদর দপ্তর চাইলে তাদের শাস্তির বিষয়টি আমাদের ওপর ছেড়ে দিতে পারত। কেননা বিষয়টির তদন্ত আমরা করেছি।
এদিকে কোর্স থেকে প্রত্যাহার হওয়া এসআইদের অভিযোগ- পুলিশ সদর দপ্তরের একজন এআইজির ব্যক্তিগত রোষানলের বলি হয়েছেন তারা। ওই এআইজি ডিসি কোর্সে ক্লাস নেওয়ার সময় অশোভন আচরণ করেন।
তখন একজন প্রশিক্ষণার্থী এসআই দাঁড়িয়ে তার কাছে জানতে চান, ‘স্যার, একজন সিনিয়র অফিসার তার জুনিয়র অফিসারকে তুই বলে সম্বোধন করতে পারেন কিনা।’ এতে ক্ষুব্ধ হন ওই এআইজি। তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের বেয়াদব বলে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যতে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। পরে ওই এআইজি-ই কোর্স বাতিলের ক্ষেত্রে কলকাঠি নেড়েছেন।
২৭ মে পুলিশ সদর দপ্তরের রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার শাখার এআইজি মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আল মামুন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, ওই কর্মকর্তা ১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত রোলকলে অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ ১৬ মে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালমা সৈয়দ পলি স্বাক্ষরিত পৃথক চিঠিতে পুলিশ সদর দপ্তরে জানান, সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণার্থীরা ওই ৩ দিন প্রশিক্ষণে উপস্থিত ছিলেন।
দুই চিঠিতে দুই রকম তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে পিটিসির এসপি (প্রশাসন) সালমা সৈয়দ পলি যুগান্তরকে বলেন, ‘চিঠি দেওয়ার বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর এবং পিটিসির অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাই বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
প্রশিক্ষণ বাতিলের শিকার কয়েকজন এসআই যুগান্তরকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে আমরা প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়ে ছিলাম। ঈদের দিন যেহেতু সারা দিন রোলকল হয়নি, কোনো ট্রেনিংও ছিল না। তাই বিকালে আমরা একটু ঘুরতে বের হয়েছিলাম। এজন্য এতবড় শাস্তি হয়ে যাবে তা কল্পনাও করতে পারিনি। এ ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্তে আমরা বাকরুদ্ধ ও হতবাক।’
এ বিষয়ে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘অপরাধের চেয়ে অনেক বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণার্থী এসআইদের। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। আইজিপির সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছি। আশা করছি বিষয়টির একটি সুরাহা হবে।’
তিনি বলেন, ‘রোলকলে অনুপস্থিতির শাস্তি হিসাবে ডিটেনশন (অতিরিক্ত সময় থাকা) বা এক্সটা ড্রিল (অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ) দেওয়ার চর্চা রয়েছে। কিন্তু বিভাগীয় এসআইদের ক্ষেত্রে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে সে ধরনের শাস্তির নজির নেই।’
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মাহফুজুর রহমান আল-মামুন যুগান্তরকে বলেন, ‘পিটিসি থেকে প্রাপ্ত রিপার্টের ভিত্তিতেই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।
কোর্স থেকে যাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তারা একেকজন একেক ইউনিট থেকে প্রশিক্ষণ নিতে এসেছিলেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের ওপর।’
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *