নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয় অসহায় কর্তৃপক্ষ

জাতীয়
স্বদেশ বাণী ডেস্ক:  সারা দেশে চলাচলরত ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের ওপর সরাসরি আইনগত নিয়ন্ত্রণ নেই নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের। কারণ এগুলোর ইঞ্জিন ১৬ অশ্বশক্তির কম ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
তাই এসব নৌযানের রুট পারমিট, সার্ভে (ফিটনেস) ও যাত্রী ধারণ সংখ্যা বেঁধে দিতে পারছে না বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহণ অধিদপ্তর। একই কারণে ওইসব ট্রলারের চালকের যোগ্যতা কী হবে-তা নির্ধারণ করা হয়নি।
আইনি দুর্বলতার সুযোগে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নৌপথে বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। এতে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা। নিবন্ধনহীন এসব নৌযানের সংখ্যা, দুর্ঘটনা ও হতাহতের কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে। বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানিয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বালুবাহী বাল্কহেড ও যাত্রীবাহী ট্রলারের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছে, সেগুলোর কোনোটিরই নিবন্ধন ও রুট পারমিট নেই। অথচ এ দুই নৌযানের মধ্যে সংঘর্ষে শনিবার পর্যন্ত ২২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় এক হাজারের বেশি এ ধরনের নিবন্ধনহীন ট্রলার চলাচল করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক যুগান্তরকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে স্থানে নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটি আমাদের নির্ধারণ করে দেওয়া কোনো রুট নয়।
যে দুটি নৌযানের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যতটুকু তথ্য পেয়েছি সেগুলোর নিবন্ধন ও রুট পারমিট ছিল না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনুমোদন ছাড়া এভাবে নৌযান চলাচল করার কথা নয়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চল, হাওড়, পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় ছোট ছোট ইঞ্জিনবিশিষ্ট এ ধরনের ট্রলার চলাচল করছে।
৫-৭ বছর আগে কোথায় কত সংখ্যক এবং কী ধরনের নৌযান চলছে সেগুলোর শুমারি করার জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও সেটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অনিবন্ধিত নৌযানের কোনো ডাটাবেজ নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরগুলোর কাছে নেই।
নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত নৌযান রয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৬টি। ১৯৯১ সাল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ৬১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে তিন হাজার ৮০০ জনের মৃত্যু হয়।
আহত হন ৫২৬ জন। নিখোঁজ রয়েছেন ৫০১ জন। দুর্ঘটনা ও হতাহতের এ হিসাব নিবন্ধিত নৌযানের। অনিবন্ধিত নৌযান দুর্ঘটনার হিসাব এ সংস্থা রাখে না। গত বছরের আগস্টে নেত্রকোনার মদনগঞ্জে হাওরে ট্রলার দুর্ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। একইভাবে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় অনেক মানুষের প্রাণহানি হয়।
ট্রলার দুর্ঘটনা কমাতে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো হবে বলে জানান নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর আবু জাফর মো. জালাল উদ্দিন।
তিনি যুগান্তরকে বলেন, ইঞ্জিনচালিত সব ধরনের নৌযানকে সুপারভিশনের আওতায় আনা ও প্রশিক্ষিত চালক থাকলে দুর্ঘটনা কমে আসবে। তিনি বলেন, আমাদের জনবল সংকট আছে। তবুও সচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালাব। করোনাভাইরাস সংক্রমণ থাকায় প্রচার কার্যক্রম থমকে ছিল।
নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ট্রলারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আইনগত অধিকার নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের নেই। অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ (আইএসও) ১৯৭৬-এর ধারা ৩ অনুযায়ী নৌযানের নিবন্ধন ও প্রতি বছর ফিটনেস সনদ নিতে হয়।
কিন্তু ১৬ হর্স পাওয়ার (অশ্বশক্তি ক্ষমতাসম্পন্ন) ইঞ্জিনচালিত নৌযানের নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক নয়। গত কয়েক বছর ধরে এ আইনটি সংশোধন প্রক্রিয়া চললেও সব ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযানে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়নি।
এছাড়া ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর জারি করা ‘বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ (নৌরুট পারমিট, সময়সূচি ও ভাড়া নির্ধারণ) বিধিমালা’ এ ট্রলারকে অন্তর্ভুক্ত করেনি নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়।
এর সুযোগ নেন ট্রলার মালিক ও চালকেরা। ছোট ছোট ট্রলারে ১৬ অশ্বশক্তির কম ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। অসংখ্য নৌযানে ১৬ অশ্বশক্তির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন থাকলেও সেগুলোর নিবন্ধন হয় না।
প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বিআইডব্লিউটিএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে রুটে ট্রলারটি চলত সেটির দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। সেটি সরকার নির্ধারিত রুট না হওয়ায় সেখানে পথ নির্দেশক বয়া ও বাতি নেই।
তিনি বলেন, ট্রলার চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। কত সংখ্যক যাত্রী বা মাল বহন করবে তা নির্ধারণ করার কেউ নেই। ফলে সারা দেশে বিপুলসংখ্যক ট্রলারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় চলাচল করছে।
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *