রিমান্ডে পিকে হালদারের দুই বান্ধবী মুখোমুখি, অতঃপর যা হলো…

জাতীয় লীড

স্বদেশ বাণী ডেস্ক: দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে কানাডায় পালিয়ে যাওয়া প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে)-এর দুই বান্ধবী নাহিদা রুনাই ও সুভ্রা রাণী ঘোষকে রিমান্ডে মুখোমুখি করানো হয়েছে। এসময় তারা অর্থ আত্মসাতে যোগসাজসের দায় নিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ করেন।

মুখোমুখি অবস্থায় দু’জনের ঠেলাঠেলিতে কিছুটা বিব্রতও হন দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তারা।

৫ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন রোববার তাদের সেগুনবাগিচা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে হাজির করা হয়। টানা প্রায় ৩ ঘন্টা পিকে হালদারের বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তাদের যোগসাজসের বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদক সচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদার সাংবাদিকদের জানান, অর্থ পাচারের মামলায় নাহিদা রুনাই ও সুভ্রা রাণী ঘোষকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা জালজালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন। এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য তাদের ৫ দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। রিমান্ড শেষে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহিদা রুনাই ও ওকায়ামা লিমিটেড এর পরিচালক সুভ্রা রানী ঘোষ। এদুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পিকে হালদারের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাত করে। তারা দু’জনই পিকে হালদারের ঘনষ্টি বান্ধবী হিসাবে পরিচিত।

রোববার সকালে তাদের কারাগার থেকে দুদক কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। নাহিদা রুনাইকে পিকের কাগুজে প্রতিষ্ঠান আনান কেমিক্যাল লিমিটেডকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে  ৭০ কোটি ৮২ লাখ টাকা নিয়ম ভেঙ্গে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

জবাবে নাহিদা রুনাই জানান, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং নামের প্রতিষ্ঠানটি মূলত পিকে হালদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তার নির্দেশেই কর্মকর্তারা সব কাজ করতেন। অন্যান্যদের মতো তিনিও দায়িত্ব পালন করেছেন। আর ওকায়ামা লিমিটেড এর পরিচালক সুভ্রা রানী ঘোষকে জাল কাগজপত্রে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যা পরবর্তীতে পিকে হালদারের সহযোগিতায় আত্মসাতের অভিযোগ আছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এর দায় চাপাতে সুভ্রা ও নাহিদা পরস্পরকে দোষারোপ করেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পিকে হালদারের যোগসাজশে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ১১শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এ পর্যন্ত ১৫ টি মামলা করেছে দুদক। গ্রেফতার করা হয়েছে ১১ জনকে। এর মধ্যে ৮ জন আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পিপুলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জল কুমার নন্দির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির সূত্র ধরেই গত ১৬ মার্চ গ্রেফতার হন নাহিদা রুনাই। ৭০ কোটি ৮২ লাখ টাকার ভূয়া ঋণের কাগজপত্র প্রস্তুত করে আত্মসাত্ মামলার আসামি তিনি। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে গত ২২ মার্চ দেশে ফেরার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই গ্রপ্তোর হন সুভ্রা রাণী ঘোষ। ভূয়া ঋণের মাধ্যমে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওকায়ামা ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সুব্রত দাস ও তার স্ত্রী সুভ্রা রাণী ঘোষসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে ওইদিনই মামলা দায়ের করে দুদক। গ্রপ্তোর হওয়ার পরপরই তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত। রিমান্ড মঞ্জুরের প্রায় ৫ মাস পর রোববার তাদের প্রথম দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদে ধীরগতি কেন? এতে বিচার প্রক্রিয়ায় কোন প্রভাব পড়বে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ১৫ টি মামলা করা হয়েছে। মামলার আসামিদের পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের লিংক ধরে অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

কে এই পি কে হালদার

পি কে হালদারের জন্ম পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তাঁর মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পি কে হালদার ও প্রিতিশ কুমার হালদার—দুই ভাই–ই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।

২০০৮ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন পি কে হালদার। ১০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই ভাই মিলে ভারতে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে কোম্পানি খোলেন ২০১৮ সালে, যার অন্যতম পরিচালক প্রিতিশ কুমার হালদার। কলকাতার মহাজাতি সদনে তাঁদের কার্যালয়।

আর কানাডায় পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনক নামে কোম্পানি খোলা হয় ২০১৪ সালে, যার পরিচালক পি কে হালদার, প্রিতিশ কুমার হালদার ও তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা সাহা। কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডার টরন্টোর ডিনক্রেস্ট সড়কের ১৬ নম্বর বাসাটি তাদের।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *