চাটমোহরে ২৬ হাত টিনের ঘরে প্রাথমিক বিদ্যালয়

জাতীয়
স্বদেশবাণী ডেস্ক: চারদিকে বিলের পানি। বিলের মাঝে সামান্য মাটির ঢিবির ওপর উঁকি দিচ্ছে টিনের ছাপরা। সকাল হলে সেখানে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিদিন। নেই খেলার মাঠ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও টয়লেট। ২৬ হাত দৈর্ঘ্যরে টিনের ঘরের মধ্যে অফিস কক্ষ, সেখানেই চলে পাঠদান। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার নেই কোনো রাস্তা। বর্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নিজেরাই নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। পাবনার চাটমোহর উপজেলার শেষ প্রান্ত হরিপুর ইউনিয়নের এমনই এক স্কুলের নাম দয়রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হলেও এ ব্যাপারে কোনো নজর নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।
সরেজমিনে শনিবার দেখা যায়, সকাল ৯টা বাজার আগেই চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বিলের অথই পানির মধ্যে দিয়ে ডিঙি চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসছে। নৌকা তীরে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ে সবাই। একে একে সব শিক্ষার্থী প্রবেশ করে শ্রেণিকক্ষে। মাটির মেঝে ও টিনের ছাপরার একটি মাত্র কক্ষে চলে অফিসের কার্যক্রম ও পাঠদান। বেঞ্চ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় অনেকেই দাঁড়িয়ে ক্লাস করে। তীব্র গরমে শিক্ষার্থীরা ঘেমে একাকার। টিন দিয়ে ঘেরা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় প্রাকৃতিক কাজ সারেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। মাঝেমধ্যেই শ্রেণিকক্ষের মধ্যে প্রবেশ করে বিষাক্ত সাপ। বিদ্যালয়ে আসতে শুকনো মৌসুমে জমির আইল আর বর্ষায় ডিঙি নৌকাই ভরসা শিক্ষক ও শতাধিক শিক্ষার্থীর।
জানা যায়, ১৯৯১ সালে প্রত্যন্ত ওই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় দয়রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। ২০১৩ সালে স্কুলটি সরকারীকরণ হয়। বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে দেড়শ জন। তবে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো কক্ষ নেই। শিক্ষক রয়েছেন চারজন। এর মধ্যে একজন রয়েছে ডিপিএইড প্রশিক্ষণে। ভালো ফলাফলের দিকে ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই বিদ্যালয়টির করুণ দশা। জানালা-দরজাও বেহাল। টিনের ছাপরা ঘরের একটি মাত্র শ্রেণিকক্ষে এই করোনার মধ্যেও গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। স্কুলে নানা সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় এলাকাবাসী চরম ক্ষুব্ধ। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে অভিভাবকরা থাকেন আতঙ্কে। বেশ কয়েকজন অভিভাবক জানান, শহরাঞ্চলের চেয়ে আমাদের এই বিদ্যালয়ের ফলাফল অনেক ভালো। কিন্তু বিদ্যালয়টি দেখে মনে হয়, এ যেন গরুর গোয়াল। দ্রুত স্কুলের নতুন ভবন তৈরি করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তারা।
প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠার সময় একটি মাত্র কক্ষে পাঠদান করানো হতো। সেই কক্ষই রয়ে গেছে। তবে সেটি এখন জরাজীর্ণ। সরকারি হওয়ার এতদিন পরও আমরা একটা নতুন ভবন পেলাম না। তবে কয়েকদিন আগে শিক্ষা অফিসার পরিদর্শন করেছেন। তিনি দেখেছেন শিক্ষার্থীদের কষ্ট।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে জানান, এ উপজেলায় যোগদানের পর প্রথমেই বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। খুবই বাজে অবস্থা সেখানে। শিক্ষার্থীরা খুব কষ্টে আসা-যাওয়া করে। শুধু তা-ই নয়, একটিমাত্র টিনের ঘরে সব শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষকরা। অতিসত্বর সেখােেন একটি নতুন ভবন তৈরি হলে ভালো হবে। বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বলে জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈকত ইসলামকে বিষয়টি জানালে তিনি যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে এখনো এমন বিদ্যালয় আছে? বিষয়টি জানা ছিল না। আমি অবশ্যই ওই বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যাব এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করব।
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *