মহালয়ার টানে

জাতীয়

স্বদেশবাণী ডেস্ক: বয়ে যাচ্ছে আশ্বিন মাস। ফুটেছে কাশফুল। চোখে পড়ছে শিউলি ফুলের গায়ে শিশির। তাই, এসময় নতুন করে বাঙালিকে বলে দিতে হয় না যে, এসেছে মহালয়া। মহালয়াতেই বাঙালির মন থেকে শুরু করে আকাশ-মাটি-নদী সব কিছু প্রস্তুত হয়ে যায় উৎসব উদযাপনে। শুরু হয়ে যায় দিন গণনা। সবাই জেনে যায়, মহালয়ার ছয় দিন পরেই মহা সপ্তমি।
এখনো চোখ বন্ধ করলে অনুভব করি, মহালয়ার দিন। দেবীর আরাধনা। দৈব শক্তির সম্মিলিত সজ্জায় সবার শুভ ইচ্ছায় তৈরি হয়ে যান দেবী, অশুভকে দমন করতে। সেজন্যই ‘রাত পোহালো শারত প্রাতে’ সবার কানে-মনে পৌঁছে যায় দেবীর অন্তহীন ইচ্ছার ভক্তির প্রকাশ। মোটকথা দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণ ’মহালয়া’।
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ প্রতিপদ শুরু হয়ে পরের অমাবস্যা পর্যন্ত পিতৃপক্ষ। পুরাণ মতে, ব্রহ্মার নির্দেশে পিতৃপুরুষেরা এই ১৫ দিন মনুষ্যলোকের নিকটে চলে আসেন। এই সময় তাদের উদ্দেশ্যে কিছু নিবেদন করলে সহজেই ওদের নাগাল পায়। স্মরণ, নিবেদন, তর্পণের চূড়ান্ত প্রকাশের শুভলগ্ন মহালয়া।
মহালয়ার পরের দিন শুক্লা প্রতিপদে দেবীপক্ষের শুভসূচনা।
এদিন থেকে কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত ১৫ দিনই দেবীপক্ষ। শ্রী শ্রী চণ্ডীপাঠের মধ্যদিয়ে দেবী দুর্গার ধরাধামে আগমনের শুভবার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বাস করা হয়, যেকোনো শুভ কাজ করার সময় প্রয়াত সকল জীব-জগতের জন্য করতে হবে তর্পণ।
কারণ, মহালয়ার সকালে লোকান্তরিত পিতৃপুরুষই না, এমনকি শত্রুকেও জলদানে তৃপ্ত করাই তর্পণ। দেবতা থেকে শুরু করে সমগ্র জীবকুল, লতা-গুল্ম, বনস্পতি-ওষুধি কিছুই বাদ থাকবে না।
বিষয়টা এরকম যে, সবকিছু আর সকলকে নিয়ে বড় করে বাঁচার ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে তর্পণের মধ্যে। অতীত ও অতীতের সকল প্রাণকে শ্রদ্ধা নিবেদন। সশ্রদ্ধ আমন্ত্রণ। তর্পণের মাধ্যমে এমন আত্মনিয়ন্ত্রণ আর কোথাও কী দেখা যায়?
অমাবস্যা তিথিতে মহালয়া উত্তরায়নের শেষ সময়। এরপর শুরু হয় সূর্যের দক্ষিণায়ন।
পুরাণে দেবী দুর্গা তথা শ্রী শ্রী চন্ডীর উদ্ভবের কাহিনীর সাথে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় মনু স্বারোচিষের অধিকার কাল। ব্রহ্মার পৌত্র চৈত্র। স্বারোচিষ মন্বন্তরে চৈত্রবংশে জন্ম নেন রাজা সুরথ। একসময় রাজ্য হারিয়ে সুরথ চলে যান গভীর অরণ্যে। ঘুরতে ঘরতে একদিন হাজির হন বেদজ্ঞ মেধস মুনির শান্ত তপোবনে। এমন সময়ে সেখানে হাজির হন আরেক ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষ। নাম যার সমাধি বৈশ্য। সব হারিয়ে তারা কেউ স্বজনদের মায়া ভুলতে পারছেন না।
পথ দেখালেন বেদজ্ঞ মহাঋষি মেধস; বললেন, শুধু মানুষ নয় ইতর প্রাণীকুলও মায়ামমতায় বশীভূত হয় এক অলৌকিক শক্তির প্রভাবে। এ অলৌকিক শক্তিই আদ্যাশক্তি মহামায়া। যে দেবীর প্রভাবেই মানুষ পরম সত্যকে বিস্মৃত হয়ে যায় এবং পৃথিবীর মায়া আর বস্তুর আকর্ষণে মজে থাকে। একথা শুনে রাজা সুরথ মহামায়ার স্বরূপ জানতে চাইলেন।
ঋষি বললেন, দেবী তত্ত্ব আর মহামায়ার কাহিনী। মাতৃরূপা দেবীদুর্গার সাধনায় প্রথমে ত্বমগুণ পরে রজঃগুণকে আয়ত্ব করতে হয়। রজঃগুণ আয়ত্বের মাধ্যমে ত্বমগুণকে পরাস্ত করতে হয়। দেবীর কাঠোমোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, এক পায়ের তলে সিংহ আর অন্য পায়ের তলে অসুর। উদ্যত সিংহ রজঃগুণের রাজসিক শক্তি আর উদ্যত অসুর ত্বমগুণের প্রতিভূ। দেবী মহামায়া জ্ঞান, ইচ্ছা ও ক্রিয়া এই তিনটি চরিত্রে নিজেকে প্রকাশ করেন।  যে তিনশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতীরূপে পূজিতা হন।
মহাকালী হলেন আনন্দরূপা। শ্রী শ্রী চন্ডী অনুসারে, সৃষ্টির আদিতে ভগবান বিষ্ণুর নাভিপদ্মে আসীন ব্রহ্মা যখন মধুকৈটভ নামক দুই দৈত্য দ্বারা আক্রান্ত হলেন, তাদের বিনাশের জন্য ইচ্ছাশক্তিরূপে মহাকালী আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনিই সৃষ্টির আদিতত্ত্ব। মহামায়ার প্রথম চরিত্র। এরপর দেবী মহালক্ষ্মী। তিনি ক্রিয়াশক্তিরূপা।
বিষ্ণু, শিব, ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতাদের শরীর থেকে নির্গত বৈষ্ণবী, শৈব, ব্রাহ্মী ও ঐন্দ্রী শক্তির সমন্বয়ে মহালক্ষ্মী। বৈচিত্র্যময়ী। উত্তর চরিত্রের দেবতা দেবী মহাসরস্বতী জ্ঞানশক্তির প্রতিভূ। অসুর, অশুভ আর অজ্ঞানতার প্রতীক। জ্ঞান দিয়ে অজ্ঞানকে বধ করতে হয়। শুম্ভাদি দৈত্যের বিনাশকারী দেবী জ্ঞানশক্তির দেবী সরস্বতী। মুনিবর মেধসের পরামর্শে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য একসময় মহামায়াকে তুষ্ট করে কৃপা লাভ করলেন।
এই ঘটনা ঘটেছিল বসন্তকালে। সেজন্যেই বাসন্তী পূজা। আর মহালয়ার দিনেই দেবী মহিষাসুর বধের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। নয় দিনের যুদ্ধে হেরে যায় মহিষাসুর। দশমী তিথি সেজন্যই বিজয়া দশমী। যে বিজয়ার দিকে টেনে নিয়ে যায় মহালয়া।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *