ষষ্ঠীতে মর্ত্যভূমিতে পা

জাতীয় লীড

স্বদেশবাণী ডেস্ক : স্কুলে পূজার ছুটি। গ্রামের ঘরে ঘরে গুড়ে খই ফেলে পাক দিচ্ছেন মায়েরা। বাতাসে ভেসে আসছে নাড়ুর ঘ্রাণ। দারিদ্র্যতায় প্রতি বছর সম্ভব না হলেও কখনো কখনো বাড়িতে নতুন জামা-কাপড় চলে আসত। সে এক দারুণ দিন।

দারুণ দিনে উৎসব হয়ে উঠেছে সবার। কে কোন ধর্মের? এটা কার উৎসব? কোনটা আমার? আর কোনটা তোমার? সেসবের কোনো পাত্তাই ছিল না শৈশবে। শিউলির রঙ সবার মনে লাগছে আর উৎসব হয়ে উঠছে সবার।

এদিকে শেষ হয়েছে পাল-মহাশয়ের ব্যস্ততা। রংতুলির আঁচড়ে দেবীর চোখে সন্তানের জন্য স্নেহ আর মুখে চিরায়ত হাসি ফুটে উঠেছে। পুরোহিত ব্যস্ত পূজোর আয়োজন নিয়ে। সবকিছুতেই তার দৃষ্টি। কারণ, তিনি চলে এসেছেন মর্ত্যভূমিতে। সাথে এসেছেন সন্তানেরা।

দেবী দুর্গাকে বরণ করতে ভক্তরা উদগ্রীব। ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর আরাধনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় শারদীয়ার আনুষ্ঠানিকতা। বোধন আমন্ত্রণ ও অধিবাসে ষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে সারাদেশে। কানে আসছে উলুধ্বনি, শঙ্খ, ঘণ্টা আর ঢাকের বোল। বাজবেই তো! আজ যে বরণের দিন।

কৈলাশের যাত্রা শেষ। মর্ত্যে নেমেছেন ঘোড়ায়। ভ্রমণ শেষে ফিরে যাচ্ছেন দোলায়।

দোলা মড়কের প্রতীক। মহামারীর চিহ্ন। দোলাং মড়কাং ভবেৎ’ মানে দোলায় গমনের ফল মড়ক। বিশ্বাস করা হয়, যদি কোনো বছর একই বাহনে আগমন আর গমন ঘটে তবে বছরটা খুব খারাপ যায়।

ষষ্ঠীতে দেবীর মুখ উন্মোচন নিয়ে পুরাণ জানাচ্ছে, সন্তানদের নিয়ে দেবী দুর্গা এদিন মর্ত্যভূমিতে পা রাখেন। কল্পারম্ভের পূজা দিয়ে শুরু হয় আচার। কোথাও কোথাও অকাল বোধনের মাধ্যমেও শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা।

ষষ্ঠী হল চন্দ্রমাসের ষষ্ঠ দিন। এদিন বংশধরদের কল্যাণ কামনায় নিবেদন করা হয়। দুর্গাপূজার সময় সন্তানদের জন্য ষষ্ঠী পূজা করেন মায়েরা। যদিও ষষ্ঠী প্রতি মাসে একবার আসে, তবুও কোনো কোনো ষষ্ঠী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন নীল ষষ্ঠীর দিনে সন্তানের কল্যাণের জন্য শিব ঠাকুরের পূজা হয়। আর জামাই ষষ্ঠী জামাতার কল্যাণে নিবেদিত।

দেবী দুর্গাকে মহাবিশ্বের মা কল্পনায় মায়েদের জন্য দিনটি বিশেষ গুরুত্বের। মায়েরা উপোস করেন বা নির্দিষ্ট সীমিত খাবার গ্রহণ করেন। অঞ্জলি দিয়ে চলে সন্তানের সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা। মায়েরা নতুন শাড়ি পরে অঞ্জলি দেন। ষষ্ঠীর দিনে গ্রহণ করেন না কোনো আমিষ খাদ্য ও চাল।

পুনশ্চ: দুর্গাপূজার তিথিগুলোতে মাহাত্ম্য আরোপের জন্য যদি সব ক’টির সঙ্গে মহানন্দে ‘মহা’ যোগ করা হয়। শাস্ত্রনির্দিষ্ট কর্মের তিথি শাস্ত্রসম্মতভাবে উল্লেখ করাই উচিত। মহাষ্টমী ও মহানবমী ছাড়া অন্য তিথিগুলিতে ‘মহা’ শব্দের প্রয়োগ শাস্ত্রে দেখা যায় না।

শাস্ত্রীয় বচন অনুসারে দুর্গাপূজাকে ‘মহাপূজা’। মার্কণ্ডেয় পুরাণে শ্রীশ্রী চণ্ডীর দ্বাদশ অধ্যায়ে জানতে পারি, ‘শরৎকালে মহাপূজা ক্রিয়াতে যা চ বার্ষিকী,’ অর্থাৎ, শারদীয়া দুর্গাপূজাই মহাপূজা।

তবে, বসন্তকালীন দুর্গাপূজাকে ‘মহাপূজা’ বলা হয়না। কেউ কেউ বলেন মহাপূজা কেবল মহামায়ার পূজা। বসন্তকালীন দুর্গোৎসব অর্থাৎ বাসন্তী পূজাও মহাপূজা। একই যুক্তিতে কালী, জগদ্ধাত্রী রূপে মহামায়ার সকল পূজাই মহাপূজা।

শেখ সাদী: গবেষক ও লেখক।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *