আঙ্গুলে ছাপ না থাকায় চরম বিড়ম্বনায় ৬ সদস্যের পরিবার

রাজশাহী

স্বদেশবাণী ডেস্ক: রাজশাহীর পুঠিয়ার অপু সরকারের দুই হাতের আঙ্গুলের দিকে তাকালে অন্য যে কোনও হাতের থেকে খুব ভিন্ন কিছু মনে হবে না। তবে তার হাতের আঙ্গুলেরই ছোট একটি সমস্যা দুর্বিসহ করে তুলছে ২২ বছর বয়সী অপুর জীবন। এক বিরল বংশগত সমস্যার কারণে অপুর দুই হাতের আঙ্গুলে কোনও ছাপ নেই। শুধু তারই নয়- তার বাবা, ভাই, জ্যাঠাসহ পরিবারের মোট ছয়জনের আঙ্গুলেই নেই কোনও ছাপ।

এক যুগ আগেও এটা হয়তো তেমন কোনও সমস্যা হিসেবেই গণ্য হতো না, কিন্তু গত কয়েক দশকে আঙ্গুলের ছাপের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বহুগুণে। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি যে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়, সেটি হচ্ছে আঙ্গুলের ছাপ।

বিরল এই বংশগত সমস্যার নাম অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়া। এ নিয়ে অপু সরকার বলেন, “আমার দাদারও একই সমস্যা ছিল। কিন্তু আমার দাদা মনে হয় না এটাকে কখনও সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।”

সুইটজারল্যান্ডের একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ইটিন এবং আরও কয়েকজন গবেষক ২০১১ সালে এ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ওই গবেষণায় তারা এই বংশগত বা জেনেটিক সমস্যার জন্য দায়ী জেনেটিক মিউটেশনকে শনাক্ত করেন।

ওই গবেষণাকালে সারা বিশ্বে মোট চারটি পরিবার শনাক্ত হয়েছিল, যারা বংশগতভাবে এই সমস্যায় ভুগছেন। এর সবগুলোই ছিল এশিয়া মহাদেশের বাইরে। তবে বাংলাদেশের রাজশাহীর অপু সরকার এবং তার পরিবারের বিষয়ে জেনে অধ্যাপক ইটিন বলেন, “আলাদাভাবে এই সমস্যা পাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। সারাবিশ্বে অল্প কয়েকটি পরিবারের কথাই আমরা এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছি।”

২০০৭ সালে এক সুইস নারী আঙ্গুলের ছাপ দিতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে বারবার সমস্যায় পড়ার পর অধ্যাপক ইটিনের শরণাপন্ন হন। সেটাই ছিল তার কাছে এ ধরণের প্রথম কোনও রোগী। পরবর্তীতে গবেষক দলটি ওই নারীর পরিবারের ১৬ জনের ওপর গবেষণা চালিয়ে বংশগত সমস্যার কারণটি খুঁজে বের করেন।

গবেষক দলটি তখন এই রোগের আরেকটি নাম দেন- ‘অভিবাসন বিলম্ব রোগ’ বা ‘ইমিগ্রেশন ডিলে ডিজিজ’। তবে এই বিড়ম্বনা এখন শুধু বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে যখন জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়, তখন থেকেই অপু সরকার আর তার পরিবারের সমস্যার শুরু।

অপুর বাবা অমল সরকার যখন বারবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে ব্যর্থ হন, তখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না যে, কী করবেন। পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এনআইডি কার্ডে লেখা হয় ‘আঙ্গুলের ছাপ নেই’।

এরপর থেকে তাদের সমস্যা শুধু বেড়েছেই। ২০১৬ সালে যখন মোবাইল সিম কার্ডের জন্য আঙ্গুলের ছাপ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন নতুন করে বিপদের মুখে পড়েন তরুণ অপু সরকার। একটু হেসে অপু বলেন, “আমি সিম নিতে যাওয়ার পর যতবার আমি আঙ্গুলের ছাপ দিতে যাই, ততোবারই সফটওয়্যার হ্যাং হয়ে যায়। তারপর যখন তাদেরকে আমার সমস্যার কথা বললাম, তারা বলল যে- স্যরি, আমরা তো আঙ্গুলের ছাপ ছাড়া সিম দিতে পারবো না।”

তবে তার মায়ের হাতের আঙ্গুলে কোনও সমস্যা নাই। এ বিষয়ে অপু সরকার জানালেন- মায়ের হাতে কোনও সমস্যা না থাকায় তিনি, তার বাবা এবং তার ছোট ভাই- তিনজনই এখন তার মায়ের নামে তোলা সিম ব্যবহার করেন।

মোবাইল ফোনের সিম ছাড়াও ২০১০ সাল থেকেই পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য আঙ্গুলের ছাপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই নিয়ম রয়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও। কয়েক মাস চেষ্টার পর সিভিল সার্জনের করে দেয়া মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট হাতে পান অপুর বাবা অমল সরকার। তবে বিদেশের বিমানবন্দরে গিয়ে আবার ঝামেলায় পড়তে হয় কিনা, সেই ভয়ে এখনও বিদেশে ভ্রমণ করার সাহস করতে পারেননি তিনি।

বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এখন বিমানবন্দরে ভ্রমণকারীদের আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়। পেশায় কৃষক অমল সরকার চলাফেরার জন্য একটি মোটর সাইকেল ব্যবহার করেন। তবে তার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ডটি নেই।

বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, “আমি রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিয়েছি। কিন্তু আঙ্গুলের ছাপ না থাকায় আমাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়নি।” যে কারণে এখন মোটরসাইকেল চালানোর সময় তিনি বিআরটিএ-তে জমা দেয়া ফি-এর রিসিটটি সঙ্গে রাখেন।

এরপরও দু’বার জরিমানা দিতে হয়েছে জানিয়ে অমল সরকার বলেন, “আমি সার্জেন্টকে বলেছি আমার সমস্যার কথা, হাতও দেখালাম। কিন্তু তারা আমার কথা শুনলেন না। এমন হলে খুব খারাপ লাগে।”

একই সমস্যা ছিল অমল সরকারের বাবা এবং দাদারও। তারা দু’জনই ছিলেন তাদের বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। অমলের দুই ভাইও একই সমস্যা নিয়ে জন্মেছেন। বড় ভাই গোপেশ সরকার প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করার পর সম্প্রতি তার পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এই পাসপোর্টের জন্য আমাকে চার থেকে পাঁচবার ঢাকায় যেতে হয়েছে, এটা বোঝানোর জন্য যে- আসলেই আমার এই সমস্যা আছে।”

গোপেশ সরকার চাকরি করেন দিনাজপুরের একটি হাসপাতালে। সেখানে যখন কর্মচারীদের হাজিরার জন্য আঙ্গুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়, তখন তিনি কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে খাতায় স্বাক্ষর রাখতে রাজী করান।

মেডিকেল বোর্ড তাদের এই সমস্যাকে ‘কনজেনিয়াল পালমোপ্লান্টার কেরাটোডার্মা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অধ্যাপক ইটিন মনে করছেন, সরকার পরিবারের বংশগত কেরাটোডার্মাই সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ায় রুপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, “সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়া তুলনামূলকভাবে বেশিসংখ্যক মানুষের থাকতে পারে। কখনও কখনও আঙ্গুলের মাথায় হালকা রেখাও থাকে কারও কারও।”

এই রোগে আক্রান্তরা ‘হাত এবং পায়ের তালুর চামড়ায় শুষ্কতার সমস্যা এবং কম ঘাম অনুভব করার কথাও বলেন’ বলে জানান অধ্যাপক ইটিন। অপু সরকারের পরিবারও একই ধরণের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন।

বিষয়টি নিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত এই তরুণ বলেন, “আমি যে কি করবো, সেটাই বুঝতে পারি না। বারবার এই বিষয়টা বোঝাতেও ভালো লাগে না। অনেককে জিজ্ঞেস করেছি যে- আমি কী করতে পারি, কিন্তু কেউ কোনও উত্তর দিতে পারে না।”

তিনি নিজে এখনও ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেননি উল্লেখ করে অপু বলেন, “একজন বলছিলো যে আদালতে গিয়ে একটা আদেশ নিতে পারলে হয়তো সব জায়গায় সুবিধা হবে। যদি কখনও সম্ভব হয়, তাহলে সেটাই হয়তো করতে হবে।”

সম্প্রতি মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখিয়ে স্মার্টকার্ড করেছেন অপু সরকার এবং তার বাবা। আঙ্গুলের ছাপ দিতে পারেননি, তবে রেটিনা স্ক্যান করা হয়েছে তাদের।

নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে- স্মার্টকার্ডের তথ্য থেকে রেটিনা স্ক্যান বা ফেসিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমেও ভবিষ্যতে সিম কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করা সম্ভব হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে যারা আঙ্গুলের ছাপ দিতে অক্ষম, তাদের জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা করা হবে কি-না, এ বিষয়ে জানা যায়নি।

অমল এবং গোপেশ সরকার ছোটবেলা থেকেই যেহেতু জানেন যে- আঙ্গুলের ছাপের এ সমস্যা তাদের বংশগত, তাই তারা কখনও চিকিৎসার চেষ্টাও তারা করেননি। তবে হাতের তালুর চামড়ার খসখসে ভাব কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছুদিন একটি ক্রিম ব্যবহার করেছিলেন অমল সরকার।

চিকিৎসার মাধ্যমে অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ার নিরাময় কখনও সম্ভব হবে কি-না, জানতে চেয়েছিলাম পিটার ইটিনের কাছে। তিনি মনে করেন, “শুধুমাত্র জিন থেরাপির মাধ্যমেই ভবিষ্যতে এটি নিরাময় সম্ভব হতে পারে।”

অমল সরকার বলছেন, কৃষিকাজ করলে তার হাতের চামড়া খুব সহজেই ফেটে যায় এবং সেটি তুলনামূলক খসখসে- এ নিয়ে তিনি এমনিতেই অস্বস্তিতে ভোগেন। তার ওপর এই সমস্যার কারণে পদে পদে অপদস্থ হতে হচ্ছে।

তার কথায়- “কারও সাথে হাত মিলাইতে গেলে সে একটু চমকে ওঠে। এইটা নিয়ে একটু লজ্জা লাগে আমার। এইটা তো আমার হাতে নাই। এটা আমার জন্মগত সমস্যা। এই সমস্যার জন্য যে আমার আর আমার ছেলেদের নিয়মিত এসব ঝামেলার মধ্যে পড়তে হচ্ছে, এটা খুব কষ্টের।” সূত্র- বিবিসি।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *