জিওব্যাগে ‘বালুর বদলে মাটি’, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

রাজশাহী লীড

স্বদেশ বাণী ডেস্ক:  চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে চলছে পদ্মার বিধ্বংসী ভাঙন। আর এ ভাঙন রোধে বালুর বদলে মাটিভর্তি জিওব্যাগ ফেলে ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছে পাউবো। এর মধ্যেই উঠেছে বড় অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলার নামে ঠিকাদার-পাউবো কর্মকর্তারা মিলে লুটে নিচ্ছেন জরুরি প্রতিরক্ষা কাজের কোটি কোটি টাকা। ভুক্তভোগী মানুষ কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তাদের বিরুদ্ধে কল্পিত চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা ও ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিন ঘুরে এসব অভিযোগ জানা যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা সর্বাধিক ভাঙনকবলিত এলাকা। পদ্মার সাতটি পয়েন্টে চলছে লাগাতার ভাঙন।

এলাকার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম বলেন, পদ্মার আলমনগর পয়েন্ট থেকে বাখর আলী ঘাট পর্যন্ত এলাকায় ব্লক ম্যাটেসিং ছিল। কিন্তু ১৬৬ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের পরও তা সময়মতো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আগস্টের শুরুতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। পুরো এলাকার সিসি ব্লক ম্যাটেসিং নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বিধ্বংসী ভাঙনে গোয়ালডুবি এলাকায় পদ্মা প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। নদীতে বিলীন হয়েছে ৫২টি পাকা বাড়িসহ অসংখ্য গাছপালা ও আমগাছ। ভাঙনের তীব্রতায় লোকজন এসব গাছপালা কাটার সময়ও পাননি।

গত ৫ সেপ্টেম্বর এলাকাটিতে আবারো তীব্র ভাঙন শুরু হয়। পাউবোর কর্মকর্তারা দুইজন ঠিকাদারকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় আসেন সন্ধ্যার সময়। রাতের দিকে শচারেক জিও ব্যাগ ও ১৫ ট্রাক মাটি ঘটনাস্থলে আনেন তারা। গভীর রাতে মাটি জিওব্যাগে ভরে নদীতে ফেলার সময় এলাকাবাসী বাধা দেন। কারণ জিওব্যাগে বালু ভরে ডাম্পিং (নিক্ষেপ) করার নিয়ম। সেখানে ব্যাগে মাটি ভরতে বাধা দেওয়ায় পাউবোর কর্মকর্তারা এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে চাঁদা দাবি ও জরুরি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ দেন।

আজিজুল ইসলামসহ এলাকাবাসী আরও বলেন, ওই রাতে চারশ জিওব্যাগ এনে দুইশ ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়। সকালে পাউবো কর্মকর্তারা ১৫ হাজার জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে বলে এলাকাবাসীকে জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকাবাসী ব্যাগ ফেলতে বাধা দেন। বুধবার পর্যন্ত মাটিভর্তি বাকি জিওব্যাগ এলাকাবাসী নদীতে ফেলতে দেননি তদন্তের দাবিতে।

এলাকার বাসিন্দা জিয়ারুল বলছিলেন, ভাঙনে আমরা বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছি আর পাউবোর লোকেরা ঠিকাদারের সঙ্গে মিলে নিজেদের পকেট ভারি করছেন। পাউবোর কর্মকর্তা আর ঠিকাদাররা মিলে লোপাট করছে কোটি কোটি টাকা। বালুর বদলে পচা মাটি ব্যাগে ভরে নদীতে ফেলছে। এলাকাবাসী এমন কয়েশ ব্যাগ আটক করে রেখেছেন, যার তদন্ত হলে সত্যতা পাওয়া যাবে।

চরবাগডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান শহিদ রানা টিপু যুগান্তরকে বলেন, কারও পৌষ মাস আর কারও সর্বশান। এ পরিস্থিতি চলছে ভাঙনকবলিত এলাকায়। পাউবোর কর্মকর্তারা ঠিকাদার সাজিদ এন্টারপ্রাইজ ও নাসেরকে দিয়ে জরুরি কাজগুলো করাচ্ছেন। সাজিদ এন্টারপ্রাইজের মালিক আশরাফুল হক ও নাসেরের সঙ্গে পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ময়েজ উদ্দীনের অংশীদারিত্বের কথা সবাই জানেন। একদিকে একের পর এক এলাকা নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে আর পাউবোর কর্মকর্তারা এটাকে পুঁজি করে ঠিকাদারদের সঙ্গে মিলে চুটিয়ে ব্যবসা করছেন। এলাকাবাসী কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তাদের চাঁদাবাজ বলা হচ্ছে।

এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাজের মান যাচাইসহ কাজ তদারকির জন্য গত ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক জরুরি এক বৈঠক করেন পাউবোর কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও এলাকাবাসীর প্রতিনিধি নিয়ে। সেখানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেবেন্দ্র নাথ উঁরাওকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের ভাঙন প্রতিরোধ তদারকি কমিটি করেছেন। কমিটি ওই দিন বিকাল থেকেই তদারকি শুরু করে।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসী অভিযোগে আরও বলেন, পাউবো থেকে ঠিকাদাররা এক সিএফটি বালুর দাম পাচ্ছেন ১৮ টাকা। কিন্তু তারা বালু না কিনে মরা পাগলা নদী খননের মাটি কিনছেন ৩ টাকা সিএফটি করে। এসব পচা মাটি বালুর বদলে জিওব্যাগে ভরে নদীতে ফেলছেন। ফলে জিওব্যাগ ভেসে যাচ্ছে পানির তোড়ে। যার কারণে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।

হাকিমপুর এলাকাতেও গত ৩ সেপ্টেম্বর ওলিউল নামের একজন ঠিকাদার বালুর বদলে জিওব্যাগে মাটি ভরে ডাম্পিং করছিলেন। অভিযোগ পেয়ে এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বিপুল পরিমাণ মাটিভর্তি জিওব্যাগ আটকে রাখেন। পরে পাউবো কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাগ থেকে মাটি ফেলে দিতে বাধ্য করেন ঠিকাদারকে।

অভিযোগ অস্বীকার করে পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ময়েজ উদ্দীন জানান, ওই দিন গোয়ালডুবি পয়েন্টে কারা বা কে মাটি নিয়ে গিয়েছিল তা তিনি বলতে পারবেন না। তিনি জানতে পেরে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটিভর্তি জিওব্যাগ ডাম্পিং করতে দেননি।

ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের বিষয়টি অস্বীকার করে এই প্রকৌশলী দাবি করেন, এলাকার কেউ ষড়যন্ত্র করে জিওব্যাগে বালুর বদলে মাটি ভরেছিল।

তবে এলাকার মানুষের দাবি, ময়েজ উদ্দীনের অংশীদার আশরাফ ও নাসেরই ১৫ ট্রাক মাটি এনেছিল।

এদিকে সাজিদ এন্টারপ্রাইজের মালিক আশরাফুল হক ও নাসের তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সেখানে তারা ট্রাকে করে মাটি আনেননি, বালু এনেছিলেন। কেউ হয়তো শত্রুতা করে বস্তার বালি ফেলে মাটি ভরে রাখে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *