৮ বছর ধরে মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতার কবলে যে স্কুল!

রাজশাহী লীড
নাটোর প্রতিনিধিঃ  মানবসৃষ্ট  জলাবদ্ধতার কারনে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নের ৭০নম্বর খিদির গরিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমলমতি শিক্ষার্থী সহ শিক্ষকদের প্রতিদিন হাটু থেকে মাজা পরিমান পচা পানি মাড়িয়ে ক্লাসে যেতে হয়। এভাবে মাজা পানি মাড়িয়ে ক্লাসে যেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় শিক্ষিকা ম্যাডামদের। মানবসৃষ্ট এই জলাবদ্ধতা  প্রায় ৮বছর ধরে বিরাজ করলেও দেখার কেউ নেই। দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ অবস্থায় বিরাজ করায় স্কুলে লেখাপড়ার পরিবেশ নেই। তবুও স্কুলমুখি কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ছুটে যায় ক্লাসে। তবে পচা পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাতায়াত করার কারণে সর্দিজ্বর ও চর্মরোগসহ পানি বাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষাথী ও শিক্ষিক ম্যাডামরা। জলাবদ্ধতার কারণে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থাও নেই। সব জলমগ্ন থাকায় একটি মাত্র শৌচাগার অসহনীয় দুভোর্গ নিয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে হচ্ছে শিক্ষার্থীসহ শিক্ষকদের। এমন পরিবেশের কারনে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এই স্কুলে আর পাঠাতে চাচ্ছেননা। সচেতন অভিভাবকদের অনেকেই তাদের সন্তানদের এই স্কুল থেকে ছাড়িয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি করেছেন। কেউ কেউ তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করেছেন। ইতিমধ্যে এই স্কুলে শিক্ষার্থী কমতে শুরু করেছে। শিক্ষকরাও অপেক্ষায় রয়েছেন বদলি পদ্ধতি চালু হলেই তারা গণহারে বদলির আবেদন করবেন। এমন অসহনীয় অবস্থা বিরাজ করায় অনেকেই স্কুলটি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গত কয়েক বছর ধরে ফসলি জমি কেটে গণহারে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন। একে অন্যের দেখাদেখি এমন পুকুর খনন করতে গিয়ে চাপিলা, মহরাজপুর ও গরিলা সহ কয়েকটি গ্রামের পানি নিস্কাসনের জন্য সরকারি বৃ-গরিলা খাল বন্ধ হয়ে যায়। যা পরবর্তীতে দখলও হয়ে যায। বর্ষা মৌসুমে কয়েকটি গ্রামের পানি এই খাল দিয়ে গিয়ে মিজার্মাহমুদ নদীতে গিয়ে পড়তো। কিন্তু শত শত পুকুর খননের কারনে ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ার কারনে প্রায় ২০ গ্রামের পানি নিস্কাসন পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব গ্রামের বাড়ি ঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ ফসলি জমি জলবদ্ধ হয়ে থাকে। জলাবদ্ধতার কারনে গত কয়েক বছর ধরে এলাকার প্রায় ৫ হাজার একর জমিতে আর ফসল আবাদ হয়না। নিস্কাসনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পুকুর মালিকদের বাড়ি সহ শোবার ঘরও জলমগ্ন হয়। জলাবদ্ধতার কারনে অনেইে গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে গিয়ে বাসবাস করছেন। অনেকেই দীর্ঘদিন ফসল ফাবাদ করতে না পেরে ভুমিহীন হয়ে পড়েছেন।
এলাকাবাসী জনায়, চাইলেও এখন সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া সম্ভব নয়। তাই রাস্তা থেকে স্কুল পর্যন্ত উচু করে ঢালাই রাস্তা নিমার্ণ এবং মাটি দিয়ে স্কুল মাঠ উচু করলেই এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।
স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি মহির উদ্দিন মোল্লা জানান, আগে চাপিলা, মহরাজপুর ও গরিলা গ্রামের বৃষ্টি পানি চলনবিলে নেমে যাওয়ার জন্য একটি খাল ছিল। এলাকার মানুষ মাছ চাষ করার জন্য অসচেতন ভাবে শত শত পুকুর কাটার সময় এই খাল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন খালটির আর কোন চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। যার কারনে বর্ষা মৌসুমের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত স্কুলটি জলাবদ্ধ হয়ে থাকে। বর্ষার পানি এখন শুধু স্কুল মাঠে নয় অনেক পুকুর মালিকের শোবার ঘরও জলমগ্ন করতে শুরু করেছে।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক হুমায়ন কবির বলেন, প্রতিষ্ঠানটি তার নিজের এলাকায় হওয়ায় এখানে যোগদানের আগে থেকেই তারা এই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য মানববন্ধনসহ নানা উদ্যোগ নিয়ে সফল হননি। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একশর নিচে নিমে গেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করলেও অভিভাবকরা এমন পরিবেশে তাদের সন্তানকে আর পাঠাতে চাচ্ছেন না। অনেকে অন্য গ্রামের স্কুলে ও মাদরাসায় তাদের সন্তানদের ভর্তি করেছে।
চাপিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন ভুট্টু বলেছেন, স্কুলের চারপাশে প্রভাবশালীরা অপরিকল্পিত ভাবে পুকুর কাটায় বছরের অন্তত ৮ মাস স্কুলটি জলাবদ্ধ থাকে। এই সমস্যা এখন ইউনিয়নের ৭৫ভাগ এলাকার সমস্যায় পরিনত হয়েছে। একটা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে এত বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। ইতিপুর্বে জেলা প্রশাসক, উপজেরা নিবার্হী অফিসার, এলজিইডি, কৃষিবিভাগ, শিক্ষা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে গিয়েছেন সমস্যা সমাধানের জন্য। কিন্তু দীর্ঘদিনেও  সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেই।
নাটোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এরশাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী সপ্তাহে তিনি নিজে স্কুলটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের সব ধরনের চেষ্টা করবেন।
নাটোর জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, এ রকম অবস্থা চলতে পারে না। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি খবর নিয়ে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা যেন সুস্থ্য সুন্দর পরিবেশে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে তার প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহন করবো ইনশাআল্লাহ। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *