তানোরে আষাঢ়ে চৈত্রের খরতাপ অতিষ্ঠ জনজীবন

রাজশাহী লীড

তানোর প্রতিনিধি: বৃষ্টির পানির জন্য চাতক পাখির মত আকাশ পানে চেয়ে আছে বাংলার নায়ক হিসেবে পরিচিত কৃষকরা। আষাঢ় মাস মানে মসুল ধারে অবিরাম বৃষ্টি। কিন্তু না জলবায়ুর বিরুপ প্রভাবের কারনে আষাঢ়ে যেন চৈত্রের খরতাপে পুড়ছে বরেন্দ্র অঞ্চল ও কৃষি ভান্ডার হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর তানোর উপজেলার জনসাধারণ। প্রচন্ড খরতাপে ঘরবন্দী হয়ে পড়েছেন এউপজেলার কৃষক শ্রমিক থেকে শুরু করে সকল শ্রেনী পেশার মানুষ। অপর দিকে আষাঢ় মাসে জমি তৈরি ও রোপা আমন ধান রোপণে ব্যস্ত থাকেন কৃষি প্রধান এই অঞ্চলের মানুষরা। কিন্তু এবারের চিত্র যেন পুরোটায় উল্টো। আষাঢ় মাসের প্রায় অর্ধেক সময় পার হলেও দেখা মিলছেনা কাঙ্খিত বৃষ্টির পানির । ফলে চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বরেন্দ্র অঞ্চল উপজেলার কৃষকরা।

কথা হয় উপজেলার সীমান্তবর্তী ভারশোঁ গ্রামের কার্তিক চন্দ্র সাহার সাথে, তিনি জানান নিম্মে হলেও বিগত আট দশ বছরের মধ্যে আষাঢ় মাসে এমন তাপদাহ দেখিনি। আষাঢ় মাস মানে বৃষ্টি আর বৃষ্টি। অথচ এবারের চিত্র পুরোটাই উল্টো। বৃষ্টির কারনে কৃষক শ্রমিকরা জমি চাষে যেমন ব্যস্ত সময় পার করে তেমনি ভাবে অনেকেই বাড়ি থেকে বের হন না। আর এবার অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারনে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।
জানা গেছে, উত্তর বঙ্গের মধ্যে অন্যতম কৃষি ভান্ডার হিসেবে পরিচিত তানোর উপজেলা। এই উপজেলায় ধান চাষাবাদ হয় প্রচুর। তারপর হয় আলুর চাষ, এরপরেই আছে মাছ চাষ। আর রোপা আমন ধান আষাঢ়ের বৃষ্টির পানিতে দ্রুত রোপন করেন। কারন রোপা আমন ধান কাটার সাথে সাথেই শুরু হয় আলুর চাষাবাদ। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়াতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন আমন চাষি ও আলু চাষিরা। রোপা আমন ধান চাষে সেচের পানি খুবই কম লাগে। কিন্তু বাধ্য হয়ে সেচ পানির মাধ্যমে জমি চাষ ও রোপন শুরু করেছেন অনেকে। কারন ইতিপূর্বেই আলু চাষের জন্য জমি লীজ হয়ে গেছে। আষাঢ় মাসে ছিটেফোঁটা বৃষ্টির দেখা মিললেও জমি চাষের উপযোগী হচ্ছে না।
উপজেলার মুন্ডুমালা ও বাধাইড় ইউপি অন্যতম বরেন্দ্র ভুমি। ওই সব এলাকায় রোপা আমন ছাড়া ধানের চাষ করতে পারেন না।
কথা হয় মুন্ডুমালা পৌর এলাকার যগদিসপুর গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলামের সাথে তিনি জানান ৪ বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান রোপণ করব। এক বিঘা জমি চাষ করতে পেরেছি। বৃষ্টি না হওয়াতে ওই এক বিঘা জমি পুনরায় চাষ করতে হবল। বাকিগুলো পড়ে রয়েছে। বৃষ্টির পানি না হওয়া পর্যন্ত জমি চাষ করা যাবে না। সেচের পানি নেওয়ারও উপায় নাই। আমাদের এলাকায় রোপা আমন ধান চাষ করা যায়।বোরো তেমন ভাবে করা যায় না। একই গ্রামের লতিফুর তিন বিঘা জমি চাষ করতে পারেন নি। কামারগাঁ ইউপির নেজামপুর গ্রামের প্রবীন কৃষক বিমল চন্দ্র প্রামানিক জানান, আমার জীবনে বিগত আট দশ বছরের মধ্যে আষাঢ় মাসে এত খরা দেখিনি। মনে হচ্ছে চৈত্র মাসের তাপমাত্রায় জলছে মানুষ। আষাঢ় মাসে কৃষক শ্রমিকরা প্রচুর ব্যস্ত সময় পার করেন। পুরোটাই উল্টো চিত্র এবারে। এতদিনে অনেকের জমি রোপন চলত, কেউ জমি চাষ করত, জমির মাঠগুলো বৃষ্টির পানিতে থইথই করে। আমি ১২ বিঘা জমিতে বোরো রোপন ধান চাষ করব। হাতিনান্দা গ্রামের কৃষক কফিলউদ্দিন জানান, যে সব জমিতে আলু চাষ হয় ওইসব জমিতে এতদিনে রোপন হয়ে যেত। বিভিন্ন জায়গায় সেচ পানির মাধ্যমে জমি রোপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারন আলু রোপনের জন্য জমি লীজ হয়ে গেছে। একই এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী আইয়ুব জানান আষাঢ় মাসে এত গোরম দেখিনি।জমিতো চাষ দুরে থাক, রাস্তায় বা দোকানে টিকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। যেমন খরতাপ সেই সাথে তাল মিলিয়েছে বিদ্যুৎ লোডশেডিং। এত ঘনঘন লোডশেডিং কল্পনাতীত।
স্বশিক্ষিত কৃষি বিজ্ঞানী নুর মোহাম্মাদ জানান, এউপজেলায় রোপা আমন চাষ হয় প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে। উপজেলার কৃষি জমি অত্যান্ত উর্বর। রোপা আমন ধানের চাষ হয় প্রচুর। এউপজেলার জনসাধারণের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে দেশের খাদ্যে ব্যাপক ভুমিকা রাখে। এবারে ভিন্ন চিত্র। বৃষ্টির পানির বিপরীতে প্রচন্ড খরতাপ। এসময় প্রায় জমি ধান রোপনের উপযোগী হয়ে পড়ে। কিন্তু বৃষ্টির পানি না হওয়াতে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তিনি আরো জানান, যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কখনো সময়মত কখনো অসময়ে বৃষ্টি হয়। এজন্য সেচ ব্যবস্হা সহজ লোভ্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
আবহাওয়ার ওয়েব সাইডে দেখা যায়, গত শনিবার তাপমাত্রা ছিল ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আজ রোববার ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করছে। আগামী সোমবার মঙ্গলবার তাপমাত্রা ৩৫/৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকবে বলেও দেখা গেছে। কিন্তু বৃষ্টি কোন কিছুই উল্লেখ নাই। মহান সৃষ্টি কর্তা যে কোন সময় কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দিতে পারেন।তিনি রহমান, তিনি রাজ্জাক। মহান আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তার বান্দার দিকে নেক নজর দিবেন। এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগ, মহান সৃষ্টি কর্তার এক রকম পরিক্ষাও বটে।
কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ জানান, বৃষ্টির পানি না হওয়ার কারনে জমি চাষ করতে পারেন নি অনেকে। আবার অনেকে সেচ পানি দিয়ে জমি চাষ ও রোপণ করছেন। এবারে উপজেলায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে।

 

সারোয়ার হোসেন
০৪জুলাই/২০২২ইং

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.