আন্দোলন চায় বিএনপি ড. কামালের না

বিশেষ সংবাদ লীড

স্বদেশ বাণী ডেস্ক: অভিভাবকহীন! এক সময়ে রাজনীতিতে ক্ষমতাধর বিএনপি। বহু স্বপ্নে ড. কামালের ইশারায় এবার নির্বাচনে গিয়ে বিরোধী দলও হতে পারেনি! রাজনীতির মাঠে লজ্জার পরাজয় ঘটে। ঈদের পরে আন্দোলনের ঘোষণায় সমালোচিত দলটির প্রতি এবার আস্থা হারিয়েছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অবশেষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের আন্দোলনের ফাঁকা বুলিতে ঐক্য ভাঙার দৃশ্যও স্পষ্ট হচ্ছে। খালেদার অনুপস্থিতিতে ড. কামাল হোসেনকে সাময়িক অভিভাবক মানলেও নির্বাচনের পর থেকে তাকে অন্য কারো এজেন্ট মনে করছে বিএনপির বড় একটি অংশ।

নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট সাত দফা দাবিতে বলেছিলো, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি ইত্যাদি, এগুলো না মানলে নির্বাচনে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এর কোনোটাই সরকার মানেনি। তবুও হাসিনার ওপর আস্থা রাখলেন ড. কামাল। এরপর গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার নেতৃত্বে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের নিয়ে সংলাপে বসেন। দিন শেষে তাও ব্যর্থ হয়! এরপরও কোন ইশারায় বিএনপি নির্বাচনে গিয়ে এই সরকারকে বৈধতা দিলো এ নিয়ে সন্দেহের দানা বেঁধেছে দলটিতে। এরই মধ্যে মওদুদসহ বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাই মির্জা ফখরুলদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। সুলতান মনসুর, মোকাব্বির খানসহ ঐক্যর বড় একটি অংশও এখন আর কোনো বৈঠকে উপস্থিত হচ্ছেন না! এদিকে বিএনপি মাঠপর্যায় থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিজেদের ঘুঁটিয়ে নিচ্ছে।

দিনদিন একসময়ের জনপ্রিয় দল বিএনপি এখন সংগঠনে রূপ নিচ্ছে বলেও রাজনৈতিক মহল থেকে দাবি উঠছে! বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনে পরাজয়ের পর পুরনো ছকে আন্দোলনে যেতে চেয়েছিলো বিএনপি। নির্বাচন বয়কট করে পুনঃনির্বাচনের দাবিতে রাজধানীসহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ, অবস্থান ও গণসংযোগের মতো কর্মসূচি নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেছিলো বিএনপি। এছাড়া রাজধানীতে বৃহৎ অবস্থা ও কয়েক লাখ লোক নিয়ে নির্বাচনের পরদিনই ঘেরাও কর্মসূচিতে যেতে চেয়ে ছিলো দলটি। এ নিয়ে ওইদিনই বিএনপি ও ২০ দলের সিদ্ধান্তের আলোকে আন্দোলনের রূপরেখা ড. কামালকে জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু বৃদ্ধ কামাল হোসেন বিএনপিকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন কোনো আন্দোলন কর্মসূচিতে গণফোরাম ও তার পক্ষ থেকে সম্মতি দেয়া সম্ভব নয়। জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের কোনো অপবাদ মাথায় নিবেন না বঙ্গবন্ধুর এই ঘনিষ্ঠচর। তাই তাৎক্ষণিক মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনের সার্বিক বিষয়টি আপাতত পর্যবেক্ষণ করবে ঐক্যফ্রন্ট। এমন সান্ত¡না দিয়ে পিছু হটলে মাঠপর্যায়ের নেতাদের মাঝে হতাশা আসে বলে জানান বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, নির্বাচনের পরে আন্দোলন দিলে নতুন করে মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে জনগণকে সম্পৃক্ত করা যেত। প্রশাসনের মাধ্যমে নির্বাচনে ভোট ডাকাতির যে অভিযোগ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যেতো। তবে এখনো লাগাতার কর্মসূচিতে থাকতে চাইছেন বিএনপির জামানত হারানো সিনিয়র নেতারা।

যদিও এখন আন্দোলনকে ফাঁকা বুলি বলে দাবি করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। মাঠের নেতাদের ভাষ্য, ফলাফল ঘোষণার পর আন্দোলনের ডাক দিলে বিএনপির ইমেজ শক্তভাবে টিকে থাকতো। আন্দোলনের ফলে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে অনেক কষ্ট হতো। যারা ভোট দিতে পারেনি তারাও বিএনপিকে সমর্থন দিতো। এছাড়াও যে সমস্ত নির্বাচন পর্যবেক্ষণ অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছিলেন সেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেতো। তবে এখন ঐক্য ধরে রেখে লাভ কী বিএনপির কাছে জানতে চাচ্ছে তৃণমূল? বিএনপি থেকে প্রস্তাবনা এসেছে, ঐক্যর পেছনে না দৌড়ে এখন সময়ের দাবি দল ও সংগঠনগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করা। কেননা নির্বাচনের আগ থেকেই ড. কামাল তাদের মতো কর্মসূচি পালন করেছে, প্রার্থী দিয়েছে আলাদা, ইশতেহার ঘোষণা করেছে আলাদা। পরবর্তী সময়ে নতুন নির্বাচনের দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচি দেয়ার ব্যাপারেও কামাল রাজি না। গায়ে কোনো কাদা মাখাবেন না।

এখন ফের তার দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ নেয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন। তাদের দুই বিজয়ী নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নেয়ার পক্ষেও তিনি ! এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দুই ভাগ হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও গত রোববার ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক শেষে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের শপথ এখন নেয়া হচ্ছে না। আমি স্পষ্ট করে বলছি, গণফোরামের কোনো সদস্য শপথ নিচ্ছেন না। তবে এ বিষয়ে সুলতান মো. মনসুর ও মোকাব্বির খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। সুলতান মো. মনসুর বলেন, আমি বৈঠকে ছিলাম না। এ ব্যাপারে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। তিনি বলেন, ড. কামাল হোসেন আমাদের নেতা। তিনি বলার পর আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকের পর গণফোরামের দেয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তির কোথাও শপথ না নেয়ার কথা উল্লেখ নেই। এমনকি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বৈঠকের পর যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, সে বিষয়টিও আমার জানা নেই।

গণফোরামের দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পড়ে শুনিয়ে তিনি দাবি করেন, ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ড. কামাল হোসেনের স্বাক্ষর নেই। মোকাব্বির বলেন, ঐক্যফ্রন্টের প্রতি তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এর দায় গণফোরামের কাছে। সুতরাং শপথ নেয়া বা না নেয়ার বিষয়ে গণফোরামের সঙ্গেই বোঝাপড়া করব। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ওদের ব্যাপারে (ড. কামাল হোসেন, সুলতান মনসুর, মোকাব্বির) আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমাদের প্রধান নেতা তারেক রহমান সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে এখন নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আমরা দলের ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোকে প্রাধান্য দিচ্ছি। অনেক নেতাকর্মী নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যেসব নেতাকর্মী জেলে রয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবর নিতে কেন্দ্রের নির্দেশনা রয়েছে।

এদিকে গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির শীর্ষ নেতাকর্মীদের সাথে অনানুষ্ঠানিক একটি বৈঠক করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি জনগণের দল, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন করবে, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করবে জনগণের সরকারের জন্য। নতুন সরকার গঠন প্রসঙ্গে ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, যে নির্বাচনের ফলাফল আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, যে নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই, জনগণ পুরোপুরিভাবে এটাকে বর্জন করেছে বলা যেতে পারে। জনগণ এই নির্বাচনের ফলাফল কখনোই মেনে নেয়নি। সেই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে কোনো পার্লামেন্ট গঠন বা সরকার গঠন এটা নিয়ে মন্তব্য করা তো হাস্যকর ছাড়া কিছু না। আমরা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করেছি, পার্লামেন্ট গঠন প্রত্যাখ্যান করেছি এবং সরকার গঠন পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ওপর রাষ্ট্র পরিচালনায় এই সরকারের কোনো অধিকার নেই। জনগণ ভোট দিয়ে এদেরকে নির্বাচিত করে নাই।

এছাড়াও গতকাল মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর বেইলি রোডে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল পৌনে পাঁচটায় শুরু হওয়া বৈঠক চলে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী। বৈঠক শেষে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতীয় সংলাপ, নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা এবং নির্বাচনের সময় যে সমস্ত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসব এলাকায় আমরা পরিদর্শনে যাব। এরই অংশ হিসেবে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সিলেটের বালাগঞ্জে যাব। বৈঠকে ড. কামাল হোসেন, ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেএসডির সভাপতি আসম আব্দুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম মেম্বার জগলুল হায়দার আফ্রিক, নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ক শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Spread the love
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.