একটি আধুনিক ও চৌকস সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে আমরা বন্ধপরিকর: রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী

রাজশাহী লীড

স্টাফ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একটি আধুনিক ও চৌকস সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে আমরা বন্ধপরিকর। এজন্য ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন পদাতিক ডিভিশন, ব্রিগেড, ইউনিট ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা সেনাবাহিনীতে তিনটি নতুন ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছি।’’

রাজশাহীতে সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৭, ৮, ৯ ও ১০ বীর ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড (জাতীয় পতাকা) প্রদান অনুষ্ঠানে এ সভা কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হেলিকপ্টারে প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী সেনানিবাসে পৌঁছেন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তিনি শহীদ কর্নেল আনিস প্যারেড গ্রাউন্ডে আসেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বীর রেজিমেন্টের চারটি ব্যাটালিয়নকে বীর এর জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল ন্ট্যান্ডার্ড) প্রদান এবং প্যারেড পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠানে মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ ডিজপ্লে প্রদর্শনি উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘প্রথমবারের মত বাংলাদেশে সেনাবাহিনীকে প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড গঠন করা হয়েছে। দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাকে আরও সুসংহত করতে সংযোজিত হয়েছে এমএলআরএস এবং মিসাইল রেজিমেন্ট। অত্যাধুনিক বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, হেলিকপ্টার, আর্টিলারি গান এবং মর্ডান ইনফ্যান্ট্রি গেজেট সংযোজন করে সেনাবাহিনীর আভিযানিক সক্ষমতাকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে।’’

আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর রূপকার, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা ও ৩০ লাখ শহিদদের স্বরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘স্বাধীনতার পর জাতির অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শক্তিশালী সশস্ত্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁর নির্দেশেই ১৯৭২ সালেই একটি প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন। তাঁর সুদূর প্রসারী ও প্রতিরক্ষা নির্দেশনার আলোকেই সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আর বাংলাদেশের সেনাবাহিনী দেশ ও দেশের বাইরে এক সম্মানজনক অবস্থা উন্নীত হয়েছে।’’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘পদাতিক বাহিনীর গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাশাপাশি পদাতিক বাহিনীর দ্বিতীয় রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন আমরাই সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছি। ১৯৯৯ সালে আমি বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট গঠনের ব্যাপারে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করি। ২০০১ সালের ২১ এপ্রিল আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট এর পতাকা উত্তোলন করি। ২০১১ সালে আমি এ রেজিমেন্টকে মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় পতাকা প্রদান করি। এই রেজিমেন্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত একমাত্র রেজিমেন্ট।’’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘বর্তমানে এই রেজিমেন্টে দুইটি প্যারা ব্যাটালিয়নসহ মোট ৪৩টি ইউনিট রয়েছে। এ রেজিমেন্টের সদস্যগণ দেশ ও দেশের বাইরে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে আপনারা একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবেন এটাই আমার প্রত্যাশা।’’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘পতাকা হল জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। তাই পতাকার মান রক্ষা করা সকল সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব। জাতীয় পতাকা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যে কোন ইউনিটের জন্য একটি বিরল সম্মান ও গৌরবের বিষয়।’’

তিনি বলেন, আজ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক ‘জাতীয় পতাকা’ আপনাদের হাতে তুলে দেওয়া হল। এই সম্মান ও গৌরব অর্জন করায় আমি ৭, ৮, ৯ ও ১০ বীরকে জানাই আন্তরিক অভিনন্নদন। কর্মদক্ষতা, কঠোর অনুশীলন এবং কর্তব্য নিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে যে পতাকা আজ আপনারা পেলেন, তার মর্যাদা রক্ষার জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারে আপনারা সব সময় প্রস্তত থাকবেন।’’

প্রধামন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনী তার মূল কার্যক্রমের পাশাপাশি সবসময়ই জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। দীর্ঘ প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ তদারকি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিনড্রাইভ সড়ক প্রকল্প, ফেনী জেলায় মহিপাল ফ্লাইওভার ইত্যাদি নির্মাণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বতার আপনাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।’’

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং বিভিন্ন বৈদেশিক মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা আত্মত্যাগ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনছে সম্মান ও মর্যাদা, যা বহিঃর্বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের চিকিৎসা সেবা আবাসনসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক সুযোগ-সুবিধা উন্নত ও বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেনাসদস্যদের রেশন স্কেল বৃদ্ধি করেছি। সেনাসদস্যদের দুস্থ ভাতা ও ক্ষতিপূরণ অনুদান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছি। সেনাবাহিনীর জেসিওর পদকে ২য় শ্রেণী থেকে ১ম শ্রেণী এবং সার্জেন্ট পদকে ৩য় শ্রেণি থেকে ২য় শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া আরও অনেক কল্যাণমুখী কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে।’’

প্রধামন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। সেনাবাহিনীকে ২০১০ সালে সর্বপ্রথম দীর্ঘমেয়াদী কোর্সে নারী অফিসার ও ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম নারী সৈনিক ভর্তির যুগান্তকারী সীদ্ধান্ত গ্রহীত হয়। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর একজন নারী ডাক্তারকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছৈ। দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের নারী কর্মকর্তাকে লেঃ কর্নেল পদে পদোন্নতি প্রদান ও ইউনিট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

‘‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত মহিলা পাইলট সংযোজন একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী অফিসার প্রথম নারী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন।’’

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারের প্রশিক্ষণ, প্রশাসন, আবাসনসহ একটি আধুনিক ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে গড়ে তুলতে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। বর্তমান ট্রেনিং ও প্রশাসনিক সুবিধা বৃদ্ধির আরও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’’

প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আমরা ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছি। আমরা সমুদ্রসীমা জয় করেছি। সীমান্তে বিরোধ নিষ্পত্তি করে আমরা ছিট মহলের সমস্যার সমাধান করেছি। জলে, স্থলে ও আকাশ সীমায় বর্তমানে আমাদের অবস্থান সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হয়েছে।

‘‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশের গণাতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সেজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। চতুর্থবারের মত এবং একটানা তৃতীয় বার সরকার গঠন করার সুযোগ পাওয়ায় আমি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আমাদের সরকার শাসক হিসেবে নয়, জনগণের সেবক হিসেবে দেশ পরিচালনা করতে চায়।

‘‘জনগণের সেবা করার জন্য আপনাদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা পেয়েছি। বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার সময়ে যখনই প্রয়োজন হবে তখনই সেনাবাহিনী জনগণের পাশে এসে দাঁড়াবে এটা আমার দৃঢ় বিশ^াস।’’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ দেশের সম্পদ, দেশের মানুষের ভরসা ও বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক। তাই পেশাদারিত্বের কাক্সিক্ষত মান অর্জনের জন্য আপনাদের সকলকে দক্ষ, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎ এবং মঙ্গলময় জীবনের অধিকারী হতে হবে। পবিত্র সংবিধান এবং দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য আপনাদের ঐক্যবদ্ধ থেকে অভ্যন্তরীণ কিংবা বাহ্যিক যে কোন হুমকি মোকাবিলায় সদাপ্রস্তুত থাকতে হবে।’’

অনুষ্ঠানে সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, ওমর ফারুক চৌধুরী, প্রকৌশলী এনামুল হক, আয়েন উদ্দিন, ডা. মনসুর রহমান ছাড়াও বিশিষ্ঠজনরা উপস্থিত ছিলেন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.