জাতীয় লীড

স্বদেশ বাণী ডেস্ক: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারপ্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার শিকার হয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার পাশাপাশি তার পরিবার ও অনুসারীদেরও হত্যার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও একটি মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৫ আগস্টের ঘটনার পরবর্তীসময় থেকে বিভাজন তৈরি হয়েছে। পাল্টেছে রাজনৈতিক পটভূমি।

পঁচাত্তরের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ এবং ৪৭ বছর পরের পরিস্থিতি নিয়ে সঙ্গে কথা বলেছেন ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনরা।

আমরা আতঙ্কে ছিলাম, বিমূঢ় ছিলাম। কিন্তু যারা মুশতাকের কেবিনেটে এবং পরবর্তীসময়ে জিয়া, এরশাদ ও বিএনপির কেবিনেটে যোগ দিয়েছিল তাদের ব্যাপারে কোনো রকম অভিযোগ ওঠে না। এটা খুবই ইন্টারেস্টিং

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক গবেষক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন  বলেন, আমাদের জীবন কেটেছে সেনাবাহিনীর অধীনে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। যখন বাংলাদেশ হলো জাতি বঙ্গবন্ধুকে পেল। সবার মতো আমরাও খুশি যে বাংলাদেশের একটা পরিণতি হলো। আমরা তখন তাকে জাতির পিতা বা রাষ্ট্রপতি হিসেবেই দেখছি। তিনি আমাদের মুক্তি এনে দেবেন। যখন ঘটনাটা ঘটেছে এটা সবাইকে বিমূঢ় করেছে। আমি মনে করি, যারা তার সমালোচনা করতেন এবং আমরা যারা সমর্থক তখন দুটো বিষয় হয়ে গেছে, একটি হলো বিমূঢ় আরেকটি আতঙ্ক।

সে সময়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে এই ইতিহাসবিদ বলেন, এখন অনেকে অনেক কথা বলেন যে কে কী করেছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, জেলহত্যা, সবকিছুই যদি এরা করতে পারে, সেখানে অন্য কোনো মানুষ কি কোনো বিষয়? আমরা আতঙ্কে ছিলাম, বিমূঢ় ছিলাম। কিন্তু যারা মুশতাকের কেবিনেটে এবং পরবর্তীসময়ে জিয়া, এরশাদ ও বিএনপির কেবিনেটে যোগ দিয়েছিল তাদের ব্যাপারে কোনো রকম অভিযোগ ওঠে না। এটা খুবই ইন্টারেস্টিং।

১৯৭৫ সালের সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মুনতাসীর মামুন বলেন, আমরা তখন ২৩-২৪ বছরের যুবক। রাজনীতি করেছি কিন্তু এ ধরনের রাজনীতিতে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম না। সামরিক শাসনে অভ্যস্ত ছিলাম, কিন্তু রক্তাক্ত রাজনীতি এটার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। পরে যখন বিভিন্ন শাসনকাল এসেছে তারা কাজ করেছে এবং আমরা আরেকটু ম্যাচিউরড হয়েছি। তখন আমাদের মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধু যে মাপের মানুষ ছিলেন অন্য রাজনীতিবিদদের আমরা সমভাবে বিচার করতে পারি না। তিনি সবাইকে নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন। একটি দেশ গড়ে দিয়েছিলেন। প্রবৃদ্ধি বেড়েছিল, উন্নয়ন হচ্ছিল, তখনই কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে যত না মূল্যায়িত হয়েছেন, আজ এতদিন পরে এখন অন্যভাবে ইতিবাচক হিসেবে তিনি মূল্যায়িত হচ্ছেন। আগে তিনি অ্যাকাডেমিকভাবে গৃহীত ছিলেন না, এখন সেটা হয়েছেন। এটাই পার্থক্য।

‘সবাই অসহিষ্ণুতাকে ভয় করে। একজন অ্যাকাডেমিশিয়ান যখন কিছু লিখবেন তখন কিন্তু তার মতো করে লিখবেন। সেখানে সমালোচনা থাকতে পারে, আলোচনা, বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এখন যদি সেরকম কিছু হয় তখন মনে হতে পারে তিনি বঙ্গবন্ধুবিরোধী। ওভাবে কিন্তু ইতিহাসকে বিবেচনা করা যাবে না। সেজন্য কেউ কিন্তু খুব একটা আগ্রহী হন না বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কাজ করতে। একই সঙ্গে একটা গবেষণা করতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় আমাদের এখানে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করা হয় না।’

বঙ্গবন্ধু শুধু আওয়ামী লীগের কিছু লোকের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতীয় নেতা। কিন্তু জাতীয় নেতা হিসেবে তাকে উপস্থাপন করেননি। তিনি একান্ত আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে ছিলেন। এটা স্বাধীন বাংলাদেশে অত্যন্ত অনৈতিক কাজ

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি সবার জন্যই অনুকরণীয় উল্লেখ করে মুনতাসীর মামুন বলেন, বঙ্গবন্ধুকে বিচার করতে হবে সমকালীন রাজনীতিতে। কীভাবে তিনি উঠে এলেন এবং কীভাবে বঙ্গবন্ধু হলেন সেভাবেই তাকে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু আমি যদি শুধু বিচ্ছিন্নভাবে আলোচনা করি যে বঙ্গবন্ধু এলেন, জয় করলেন, চলে গেলেন তাহলে তার সঠিক মূল্যায়ন হবে না। কারণ বঙ্গবন্ধুকে তখন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।’

বঙ্গবন্ধু ও খন্দকার মোশতাকের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে এই ইতিহাসবিদ বলেন, বঙ্গবন্ধু ও মোশতাক সমসাময়িক ছিলেন। বাকিরা তার জুনিয়র ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মোশতাকের তুমি তুমি সম্পর্ক ছিল, বাকিদের সঙ্গে সেটা ছিল না। তার সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং ৬ দফা নিয়ে মোশতাক অনেক বেশি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি হয়তো ভাবেননি মোশতাক এমন একটি কাজ করতে পারেন।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক  বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার মৃত্যু বাংলাদেশের মানুষের সবার কাছেই কষ্টের, আমাদের কাছে তো বটেই। অনেক বছর ধরে এই দিনে অনেক কথাবার্তা বলা হতো দলীয় স্বার্থে, যেগুলো ঠিক বাস্তবসম্মত নয়। বঙ্গবন্ধু শুধু আওয়ামী লীগের কিছু লোকের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতীয় নেতা। কিন্তু জাতীয় নেতা হিসেবে তাকে উপস্থাপন করেননি। তিনি একান্ত আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে ছিলেন। এটা স্বাধীন বাংলাদেশে অত্যন্ত অনৈতিক কাজ।

অধ্যাপক আবুল কাসেম বলেন, আমার মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে ছাত্রলীগের সাতজন ছাত্রনেতাকে ছাত্রলীগেরই আরেকটি গ্রুপ হত্যা করেছিল। এই যে দুই গ্রুপ এক গ্রুপ নিহত হয়েছে, আরেক গ্রুপ হত্যা করেছে। এখানেই দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের উপরের স্তরের কিছু নেতা হত্যাকারীদের সমর্থক এবং কিছু নেতা যারা নিহত হয়েছিলেন তাদের সমর্থক ছিলেন। এতেই প্রকাশ পায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের বিরোধ। ফলে ১৫ আগস্টের মতো হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। বিরোধ থাকাটা স্বাভাবিক, তবে বিরোধ যে একেবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যায় সেটা মর্মান্তিক। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার উপলক্ষে কমিশন করে ব্যবস্থা নেবেন বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এটি ভালো। কিন্তু এত দীর্ঘকাল পরে কেন?

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের ষড়যন্ত্র এখনো নানাভাবে আছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে কিন্তু পুরো ষড়যন্ত্রের মুখোশ এখনো উন্মোচিত হয়নি। এই ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন হওয়া অত্যন্ত জরুরি

‘বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে সারাদেশে একেবারে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আরও বেশ কিছু লোক নিহত হয়। তাদের সংখ্যাও কম হবে না। তাই সব ঘটনা একসঙ্গে না দেখলে সত্য থেকে অনেক দূরে বা প্রকৃত ইতিহাস থেকে দূরে থাকতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক  বলেন, বঙ্গবন্ধু যে পরিকল্পনা নিয়ে দেশ শাসন করেছিলেন সেটা যদি বাস্তবায়ন করা যেত তাহলে আমরা অনেক এগিয়ে যেতাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের শাসনে অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছিল দেশ। সেখান থেকে এখন আমরা আবারো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের ষড়যন্ত্র এখনো নানাভাবে আছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে কিন্তু পুরো ষড়যন্ত্রের মুখোশ এখনো উন্মোচিত হয়নি। এই ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

‘কারণ আমরা দেখেছি, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন বলে সরকারি কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ১৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে কিছু মানুষের উল্লাসও আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়। যদিও সারা জাতি শোকস্তব্ধ অবস্থায় ছিল। এ কারণে এখন প্রয়োজন একটি কমিশন, যে কমিশন এই পুরো ষড়যন্ত্রের জাল উন্মোচন করবে।’

আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, এখন ষড়যন্ত্রের জালগুলো যদি উন্মোচিত হয় তাহলে হয়তো এ ধরনের সন্ত্রাসী ও জঘন্য ঘটনার পুনরাবৃত্তি এই দেশে আর হবে না। সেই পরিকল্পনা তো শুধু সে রাতে করেনি। এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিল তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়া দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান  বলেন, ১৫ আগস্ট সমাবর্তন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেজেছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকারপ্রধান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসবেন এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি মর্যাদার ও গৌরবের বিষয় ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সেটি খুবই হতাশার যে সেদিন জাতির পিতাকে বিশ্ববিদ্যালয় পায়নি। যেটি আমরা এখন অনুভব করি। আসলে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, সেটি পুরো জাতির জন্যই বেদনাদায়ক। এটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো বিশ্বের মধ্যেই একটি বর্বরোচিত, পৈশাচিক ও অমানবিক ঘটনা।

উপাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেজন্যই নানা কর্মসূচির প্রয়াস নিচ্ছে। জাতির পিতাকে সম্মানসূচক সর্বোচ্চ ডিগ্রি দেওয়ার একটি উদ্যোগ আমাদের আছে। বঙ্গবন্ধুর নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড লিবার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেটির আলোকে নিয়মিত গবেষণা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে তার জীবন দর্শন, রাজনীতি, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দর্শন সবকিছু নিয়েই সেই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। এগুলোই আমাদের চেতনার জায়গাটি শাণিত করা। বঙ্গবন্ধুর প্রতি জাতির যে অপরিসীম ঋণ তার প্রতি সম্মান জানাতেই আমাদের এই আয়োজন।

স্ব.বা/র

 

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.