সংঘর্ষে বছর শুরু আর আন্দোলনে শেষ

শিক্ষা

স্বদেশবাণী ডেস্ক: ঘটনাবহুল বছর ২০২০ সাল। বছর জুড়েই গোটা বিশ্বময় রয়েছে ঘটনার ঘনঘটা। ২০১৯ সালের শেষের দিকে এবং চলতি বছরের শুরুতেই করোনা নামক অদৃশ্য শক্তির জালে আটকা পড়েছে বিশ্ব। সভ্যতার শিখরে আরোহন করা বিশ্বকে নিমিষেই ঘরবন্দী করেছে করোনার এই ভয়াল থাবা। মার্চের মাঝামাঝি থেকে একদিকে শিক্ষার্থীরা হয়েছে শিক্ষাঙ্গন ছাড়া অন্যদিকে স্থবিরতা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে। নীতি-দুর্নীতি, সুখ-দুঃখ এবং সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে এবছরে দেশ ও জাতির মধ্যে রচিত হয়েছে এক নতুন ইতিহাস।

এদিকে বছরজুড়ে সেই ইতিহাসের আলোচিত অংশ হয়েছে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত অন্যতম বিদ্যাপীঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি) ক্যাম্পাসটিও। বছরের শুরুতেই বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, নানান দাবিতে বছরব্যাপী বিভিন্ন আন্দোলন, শিক্ষককে হত্যার হুমকিতে ছাত্র-শিক্ষকের মুখোমুখি অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ভবন থেকে ৪৯ টি কম্পিউটার চুরিসহ একের পর চুরির ঘটনা, কর্মকর্তা কর্তৃক শিক্ষকদের হুমকি, অনিয়মের দায়ে প্রকল্প পরিচালকের অব্যাহতি কিংবা বছরের শেষদিকে আপগ্রেডেশনের দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনসহ বছরব্যাপী দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বশেমুরবিপ্রবি।

অপরদিকে শিক্ষা ও গবেষণায় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অবদান, দীর্ঘদিন পর নতুন উপাচার্যের আগমন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, করোনায় বশেমুরবিপ্রবির মানবিক কার্যক্রম, সংকট উত্তরণে উপাচার্য কর্তৃক নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এতসব ঘটনাকে ছাপিয়ে সকলের প্রত্যাশা নতুন বছরে সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ একটি ক্যাম্পাসের। বছর জুড়ে ৫৫ একরের মাঝে ঘটে যাওয়া সব আলোচিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এবারের আয়োজন- “ফিরে দেখা বশেমুরবিপ্রবি-২০২০ঃ সংঘর্ষে বছর শুরু আর আন্দোলনে শেষ।”

নবীন বরণ-২০২০:
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের প্রথম দিনেই নতুন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত হয় অরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম-২০২০। এতে নতুন ভর্তি হওয়া ৩৪ টি বিভাগের প্রায় ২ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ:
২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ১ম বর্ষের জুনিয়র মেয়েকে ফোন করা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ বাঁধে। ভাঙচুর করা হয় ৬ টি শ্রেণিকক্ষ, আহত হয় উভয় বিভাগের কমপক্ষে ১৫ জন শিক্ষার্থী। ১৫ ফেব্রুয়ারী চরপাথালিয়ার স্থানীয় দোকানির হামলার শিকার হন বশেমুরবিপ্রবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী  মেহেদী হাসান মারুফ। প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দোকান ভাঙচুর। আইন বিভাগ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মধ্যকার সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই ৮ মার্চ অফিসরুম বর্ধিতকরণকে কেন্দ্র করে এপ্লাইড কেমিস্ট্রি এন্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও আন্তর্জাতিক  সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধে। এতে শিক্ষকসহ উভয় বিভাগের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ১০ শিক্ষার্থীকে।

শিক্ষক সমিতি নির্বাচন ২০২০:
১০ মার্চ বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীকারের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষক পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করে। নির্বাচনে ১৩০ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু ইনস্টিটিউট অব লিবারেশন ওয়ার (বিলওয়াবস) এর ড. হাসিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো রকিবুল ইসলাম ১৪০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

নানা দাবিতে বছরব্যাপী বিভিন্ন আন্দোলন:
বছরব্যাপী বিভিন্ন দাবিতে কর্মবিরতি, অনশন, মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিসহ আন্দোলনে উত্তাল ছিল বশেমুরবিপ্রবি। আন্দোলনেই বছর শুরু হয় বশেমুরবিপ্রবির। জানুয়ারিতে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে বছরের প্রথমেই অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক (মাস্টাররোল) কর্মচারীরা। ‘ইটিই’ বিভাগকে ‘ইইই’ বিভাগে রুপান্তরের দাবিতে টানা আন্দোলনের ৯১ তম দিনে এসে ১৫ জানুয়ারি থেকে ‘ইটিই’ বিভাগের শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন শুরু করে। এতে ‘ইটিই’ বিভাগের ১৭ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করে ‘ইটিই’ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ‘ইটিই’ বিভাগকে একীভূতকরণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধন করে ‘ইইই’ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান খসরুল আলমকে হত্যার হুমকি ও অন্যান্য শিক্ষকদের লাঞ্চনা,নিগ্রহের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি মানববন্ধন ও ২১ জানুয়ারি থেকে ৩ দিন কর্মবিরতি পালন করে বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষকরা।

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিক ও মার্চ মাসের শুরুতে ইউজিসির অনুমোদনের দাবিতে ইতিহাস বিভাগ প্রশাসনিক ভবন ও একাডেমিক ভবনে তালা দিয়ে টানা আন্দোলন করতে থাকে। দাবি পূরণের লক্ষে তারা আমরণ অনশন, গণস্বাক্ষরসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে কার্যত ২ সপ্তাহ যাবত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকে। অন্যদিকে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান বাবলু কর্তৃক ফেসবুকে শিক্ষিকাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে ১৫ মার্চ মানববন্ধন করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।  সাংবাদিক আসাদুজ্জামান বাবলুকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

অক্টোবর-নভেম্বর মাসে অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তির দাবিতে বন্ধ ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও অনশন কর্মসূচি পালন করে কয়েকজন ভর্তিচ্ছু। এ বিষয়টিকে স্বার্থান্বেষীদের ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে নতুনভাবে ভর্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। সারাদেশে লাগাতার ধর্ষণ, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় পৃথক সময়ে মানববন্ধন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ডিসেম্বর মাসে বশেমুরবিপ্রবিতে পদোন্নতিবঞ্চিত শিক্ষকরা আপগ্রেডেশনের দাবিতে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। প্রশাসনের আশ্বাসে শিক্ষকদের আন্দোলন স্থগিত করা হয়। একাডেমিক  কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও নভেম্বরে ‘ইটিই’ বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ে মানববন্ধন করে। অন্যদিকে ডিসেম্বরে ‘ইটিই’ বিভাগকে ‘ইইই’ তে রুপান্তরের পদক্ষেপের বিপক্ষে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন করে ‘ইইই’ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বছরের ঠিক শেষ দিকে এসে ৩০ জানুয়ারি থেকে মূল বিভাগের সাথে একীভূতকরণের দাবিতে প্রশাসনিক ভনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আইসিটি ইনস্টিটিউট এর শিক্ষার্থীরা।

ক্যাম্পাসে ব্যতিক্রমী গায়ে হলুদ ও বিনোদনী বিক্ষোভ মিছিল:
ক্যাম্পাসে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠিত হয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জুয়েল ও আশার। ক্যাম্পাসে প্রথম কোন দম্পতির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি ব্যাপক আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। গায়ে হলুদকে ঘিরে বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। প্রেমের সমবন্টনে ১৪ ফেব্রুয়ারী ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে প্রেমবঞ্চিত সিঙ্গেল শিক্ষার্থীরা। “বাঙ্গালিয়ানায় সাজবো সাজ , পিঠা উৎসবে মাতবো আজ” এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে প্রতি বছরের ন্যায় ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা বিভাগের আয়োজনে পালিত হয় পিঠা উৎসব-১৪২৬।

শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসবিহীন জীবনের দীর্ঘশ্বাস:
মার্চের ১৮ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর থেকে নজিরবিহীন ছুটি যাপনে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা। এখন যেন ছুটিই তাদের একমাত্র বিরক্ত আর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বন্ধ জীবনের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। তাই বছর জুড়ে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে ক্যাম্পাস খোলার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে অনেকে আবার করোনার ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে ক্যাম্পাস না খোলার পক্ষে মতামত তুলে ধরছে। সব মিলিয়ে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় শেষ হতে চলেছে করোনাময় এই বছরটি। এদিকে বন্ধে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেয় বশেমুরবিপ্রবি প্রশাসন। ১ জুলাই থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবারের মত ৩১টি বিভাগে অনলাইন ক্লাস শুরু করেছিলো বশেমুরবিপ্রবি৷ কিন্তু ডিভাইস সংকট, আর্থিক সংকট ও দুর্বল ইন্টারনেটের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকায় কিছুদিন পরেই বন্ধ হয়ে যায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। পরবর্তীতে নতুন উপাচার্য যোগদানের পর ১৮ অক্টোবর থেকে পুনরায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দফায় দফায় ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। কবে খুলে দেয়া হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাজ করছে সকলের মাঝে। অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চললেও পরীক্ষা নেয়া বন্ধ রয়েছে। এতে দীর্ঘ সেশনজট ও চাকরির অনিশ্চয়তায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা।

নতুন উপাচার্য নিয়োগ:
অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, নীতিস্থলনের প্রতিবাদে বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্য খোন্দকার নাসিরউদ্দিন বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। টানা আন্দোলনের ১২ দিনের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিকস এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোঃ শাহজাহানকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব প্রদান করা হয়। অবশেষে দীর্ঘ ১১ মাস পর ২ সেপ্টেম্বর বশেমুরবিপ্রবির পূর্ণাঙ্গ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুবকে।

মুজিববর্ষ উদযাপন:
বশেমুরবিপ্রবিতে ১ মার্চ থেকেই মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরু হয়। মুজিববর্ষ উপলক্ষে “বঙ্গবন্ধুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা” বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ২১ অক্টোবর থেকে ১৫ দিনব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্ভোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. একিউএম মাহবুব। “বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাঃ সংবিধানের আলোকে বাংলাদেশ” শীর্ষক সেমিনার এর আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এর চেয়ারম্যান বিচাপতি মমতাজউদ্দিন আহমেদ

করোনাকালীন মানবিক বশেমুরবিপ্রবি:
রসায়ন ও এসিসিই বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও বিতরণ করা হয়। করোনায় হতদরিদ্র পরিবারের পাশে এগিয়ে আসেন বশেমুরবিপ্রবির ১২৪ জন শিক্ষক। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে একদিনের বেতন প্রদান করেন বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষকরা।  সাত মাস বেতন বন্ধ ১৭৬ জন অস্থায়ী কর্মচারীকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন শেখ নাঈম, প্রদত্ত খাদ্যসামগ্রী কর্মচারীদের হাতে তুলে দেন বশেমুরবিপ্রবি ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। বাড়িভাড়া মওকুফে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বাড়িওয়ালাদের বৈঠকে স্থানভেদে শতকরা ২৫ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত বাড়িভাড়া মওকুফ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ১ মাসের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে পাশে দাঁড়ায় বশেমুরবিপ্রবিয়ানরা।

অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের মাঝে ঈদ উপহার প্রদান করে বশেমুরবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি। করোনায় খাদ্যসামগ্রী, বন্যাদুর্গতদের আর্থিক সাহায্য, শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন। ইউজিসির শিক্ষাঋণ এর জন্য মনোনীত হন বশেমুরবিপ্রবির ১৫০৮ জন শিক্ষার্থী।

কম্পিউটার চুরি নিয়ে আলোচনায় বশেমুরবিপ্রবি:
বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল বশেমুরবিপ্রবির চুরিকান্ড। ঈদুল আজহার ছুটিতে একুশে ফেব্রুয়ারি লাইব্রেরি ভবনের গ্রিল কেটে ৪৯ টি কম্পিউটার চুরি করা হয়। তারমধ্যে রাজধানী থেকে ৩৪ টি কম্পিউটার উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় হোটেল মালিকসহ মোট আটজনকে আটক করা হয়। ঘটনার প্রকৃত দোষীদের বিচারের দাবীতে মানববন্ধন করা হয়। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কমিটির সদস্য সহকারী রেজিস্ট্রার মোঃ নজরুল ইসলামকে অব্যহতি দেয়া হয়। এই ঘটনায় তদন্ত কমিটিকে দেখে নেওয়ার হুমকির অভিযোগে নজরুল ইসলাম হিরার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। লাইব্রেরি থেকে কম্পিউটার চুরির রেশ কাটতে না কাটতেই ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দুইটি কম্পিউটার চুরি করা হয়। এর কিছুদিন পর ডরমিটরি থেকে স্যানিটারি ফিটিংস চুরি করা হয়। এদিকে নভেম্বরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একাউন্ট থেকে চেক জালিয়াতি করে আড়াই লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। চোর টাকা ফেরত দিলেও অজানা কারণে এখন পর্যন্ত তার পরিচয় প্রকাশ করেনি প্রশাসন।

মেধাবীদের বিয়োগ:
২৬ ফেব্ররুয়ারী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম মুবিন। ১৫ মার্চ বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে প্রাণ হারান বশেমুরবিপ্রবি লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদি হাসান। ১০ জুলাই, বশেমুরবিপ্রবি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর দু’মাস পর ১০ অক্টোবর আত্মহত্যা করেন বশেমুরবিপ্রবি ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের মনীষা হীরা।

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি:
শিক্ষা ও গবেষণায় ভূমিকা রাখে বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক পান বশেমুরবিপ্রবির ছয় শিক্ষার্থী। ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে টারবাইনবিহীন উইন্ডমিল তৈরি করা হয়। বশেমুরবিপ্রবিতে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয় ৫৪ কোটি ২ লাখ টাকা। এতে গবেষণায় বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৫ লাখ টাকা। ২৯ সেপ্টেম্বর দশ মাস পর বশেমুরবিপ্রবির চিকিৎসা কেন্দ্রে ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়। ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল কমপ্লেক্স নির্মাণের অনুমতি প্রদান। একাডেমিক ভবন ও হলের সম্প্রসারণ কাজ, মেইন গেইট, সুপেয় পানির কেন্দ্র সম্প্রসারণসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজের উদ্যোগ নেয়া হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ লিফের এম্বাসেডর নির্বাচিত হন ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান তছলিম আহম্মদ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ও লোকপ্রশাসন বিভাগের ৩ শিক্ষার্থী সার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। এতো স্বত্বেও অপ্রাপ্তি হিসেবে রয়েছে- এক বছর পার হলেও ভিসিবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ও সাংবাদিক নির্যাতনের বিচার হয়নি আজও। এনিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। কম্পিউটার চুরির মূলহোতাকে প্রকাশ্যে আনা হয়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেক চোরের নাম প্রকাশ করা হয়নি অজানা কারণে।

উল্লেখযোগ্য:
দীর্ঘদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রভাত ফেরি ও ৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালিত হয়। ১ ডিসেম্বর যোগদান করেন বশেমুরবিপ্রবির নতুন রেজিস্ট্রার মোঃ আব্দুর রউফ।  বশেমুরবিপ্রবির নতুন ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান ড. শরাফত আলী। এফএমবি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, একাউন্টটিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। কৃষি বিভাগের আলিফ লায়লা নামের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের হুমকি প্রদান, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মাগুরা সদর থানায় জিডি করেন। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ফলে বাড়িওয়ালাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। বাড়িওয়ালা কর্তৃক বশেমুরবিপ্রবি ২ ছাত্রীকে শারীরিক হেনস্থা। কর্মকর্তা কর্মচারীদের অনিয়মের অভিযোগে রেজিস্ট্রার কর্তৃক বিজ্ঞপ্তি জারি। কোটি কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগে সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর ২৩ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান ভূঁইয়া।

সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য ড. একিউএম মাহবুব এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অতীতের দিকে তাকাতে চাইনা। আমরা অতীত ভুলে সামনের দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয়টাকে শিক্ষা ও গবেষণার উপযুক্ত করে গড়ে তোলে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।”

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *